সরকারি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) কর্তৃপক্ষ নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) কে সংযুক্ত আরব আমিরাতের লজিস্টিকস দায়িত্বশীল DP World-কে লিজে দেওয়ার পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে, ঢাকা শহরে দুই দিনের কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে টার্মিনালের জন্য রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP) ও প্রাথমিক কনসেশন চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা হবে। কর্মশালাটি আগামী সোমবার ও মঙ্গলবার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে, যা PPP কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ প্রচার বিভাগের পরিচালক ৩০ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত নোটিশে নিশ্চিত করেছেন।
PPP কর্তৃপক্ষের নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কর্মশালায় টার্মিনালের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শর্তাবলী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের কাঠামো নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে। এই দুই দিনের সেশনটি স্থানীয় ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (CPA) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে। CPA-র কর্মকর্তারা কর্মশালার সময়সূচি ও স্থান নিশ্চিত করে, টার্মিনালের কার্যকর হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করবেন।
ডিসেম্বর ৪ তারিখে উচ্চ আদালতের একটি বেঞ্চ DP World-কে চুক্তি প্রদান নিয়ে দায়ের করা রিট পিটিশনের বৈধতা নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে। একদল বিচারক চুক্তির আইনি ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ করেন, অন্যদিকে অন্য বিচারক তা বৈধ বলে মত দেন। এই বিভাজনমূলক রায়ের পরেও সরকার লিজ প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করার সংকল্প প্রকাশ করেছে।
NCT, যা চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার সর্ববৃহৎ কন্টেইনার টার্মিনাল, একসাথে চারটি মহাসাগরীয় জাহাজ এবং একটি ছোট জাহাজকে সেবা দিতে সক্ষম। এই ক্ষমতা দেশের রপ্তানি-আমদানি প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং বন্দর কার্যক্রমের গতি বাড়ায়। টার্মিনালের আধুনিক অবকাঠামো ও গভীর জাহাজড্রইং ক্ষমতা আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই লিজের উদ্যোগটি পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু হয়, যখন সরকার-থেকে-সরকার (G2G) PPP মডেলের মাধ্যমে বিদেশি অংশীদারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার একই কাঠামো বজায় রেখে, DP World-কে অপারেটর হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে। এই ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতি স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয় এবং বাণিজ্যিক পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, DP World-র মতো বিশ্বমানের লজিস্টিকস কোম্পানি টার্মিনাল পরিচালনা করলে চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে শক্তিশালী করা সম্ভব। অপারেশনাল দক্ষতা বৃদ্ধি, কন্টেইনার টার্নঅ্যারাউন্ড সময়ের হ্রাস এবং সেবা মানের উন্নতি সরাসরি বন্দর ব্যবহারকারী শিপিং কোম্পানিগুলোর খরচ কমাবে। ফলে রপ্তানি-আমদানি খাতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য উন্নত হবে।
তবে কিছু ঝুঁকি অবশিষ্ট রয়েছে। উচ্চ আদালতের বিভাজনমূলক রায়ের পরেও আইনি চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা রয়েছে, যা চুক্তির বাস্তবায়নকে বিলম্বিত করতে পারে। এছাড়া, লিজের শর্তাবলীতে রেভিনিউ শেয়ারিং, ট্যাক্স সুবিধা এবং স্থানীয় শ্রম ব্যবহারের অনুপাত নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের লাভজনকতাকে প্রভাবিত করবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নীতি পরিবর্তনও দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি লিজ চুক্তি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে টার্মিনালের আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্দর আয় বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, DP World-র নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নতুন শিপিং রুট ও কন্টেইনার ফ্লো যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের লজিস্টিকস খাতের বিকাশে সহায়ক হবে। তবে চুক্তির শর্তাবলীর স্বচ্ছতা ও স্থানীয় অংশীদারদের ন্যায্য অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা বজায় থাকে।
সারসংক্ষেপে, সরকার DP World-কে লিজে দিয়ে NCT পরিচালনা করার পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এবং এর জন্য ঢাকা শহরে দুই দিনের কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের বিভাজনমূলক রায় সত্ত্বেও প্রক্রিয়া চালু রয়েছে, এবং টার্মিনালের ক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যতে এই লিজের সফল বাস্তবায়ন চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক শিপিং হাব হিসেবে শক্তিশালী করতে পারে, তবে আইনি, রাজনৈতিক ও আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন।



