উত্তর কোরিয়া ৪ জানুয়ারি রবিবার সকাল প্রায় ৮ টায় পিয়ংইয়ং থেকে সমুদ্রের পূর্ব উপকূলের দিকে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী এই নিক্ষেপের তথ্য নিশ্চিত করে এবং জানায় যে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সমুদ্রের দিকে গিয়েছে, তবে কোনো ভূমি আঘাতের রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার সময় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইয়োল চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে ছিলেন, যা কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি আলোচনা চালানোর লক্ষ্যে পরিকল্পিত।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সূত্র অনুযায়ী, নিক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উচ্চ গতিতে উড়ে সমুদ্রের দিকে গিয়েছে এবং কোনো সিভিলিয়ান এলাকায় পৌঁছায়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুতই সতর্কতা জারি করে এবং নিকটবর্তী নৌবাহিনীর প্রস্তুতি বাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইয়োলের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার পটভূমিতে এই নিক্ষেপকে একটি সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, শি ও ইউনের আলোচনার মূল লক্ষ্য হল চীনের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের পথ প্রশস্ত করা, কারণ পূর্বে উত্তর কোরিয়া ইউনের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকে উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক চাপে প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, চীনের ভূমিকা এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্যারিসের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে চীনকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমও নজরে এসেছে। শনিবার তিনি একটি অস্ত্র উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন এবং সেখানে উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে, কিম একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনেরও পরিদর্শন করেন, যা উত্তর কোরিয়ার সামরিক আধুনিকীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে বিশ্লেষকরা মূল্যায়ন করেন। এই দুইটি ভিজিটের মাধ্যমে কিমের লক্ষ্য সম্ভবত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তার সামরিক সক্ষমতা দৃঢ় করা।
উত্তর কোরিয়ার সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের অস্ত্র পরীক্ষার ধারাবাহিকতা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিবেশকে উদ্বিগ্ন করেছে। পূর্বে একই সময়ে বহু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং কৌশলগত রকেটের নিক্ষেপের রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছে, যা দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতিকে তীব্র করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, এই ধারাবাহিকতা কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এই নিক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক সমন্বয় বাড়িয়ে নিয়েছে এবং নিকটবর্তী সামুদ্রিক অঞ্চলে নজরদারি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে, কূটনৈতিক স্তরে দক্ষিণ কোরিয়া চীনের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে উত্তরের সামরিক কর্মকাণ্ডের পেছনের প্রেরণা বোঝা যায় এবং সম্ভাব্য উত্তেজনা হ্রাসের উপায় খোঁজা যায়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন, এই সময়ে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি আলোচনা এবং কূটনৈতিক মিটিংয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে, তবে উত্তর কোরিয়ার সামরিক পদক্ষেপগুলো এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে, শি জিনপিং এবং ইউন সুক-ইয়োলের মধ্যে চলমান আলোচনার ফলাফল কোরিয়ান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উত্তর কোরিয়ার এই নিক্ষেপের পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মহাকাশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আগামী কয়েক দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত ডেটা সংগ্রহ করবে। একই সঙ্গে, কোরিয়ান দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে।
বিশ্লেষকরা আশা করেন, যদি শি জিনপিং এবং ইউন সুক-ইয়োলের আলোচনায় উত্তরের সামরিক কর্মকাণ্ডের প্রতি স্পষ্ট নীতি গৃহীত হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় মাত্রার অস্ত্র পরীক্ষা রোধ করা সম্ভব হতে পারে। তবে, উত্তর কোরিয়ার স্বতন্ত্র কূটনৈতিক কৌশল এবং তার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি বিবেচনা করলে, এই ধরনের নিক্ষেপের পুনরাবৃত্তি ঝুঁকি এখনও বিদ্যমান।
সারসংক্ষেপে, পিয়ংইয়ং থেকে সমুদ্রের পূর্ব উপকূলের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন উত্তেজনা যোগ করেছে। একই সঙ্গে, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা এই উত্তেজনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



