ঢাকা, ৪ জানুয়ারি – ২০০৯ সালের পিলখানা গুলিবিদ্ধ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রাক্তন বডিআর সদস্যদের ওপর চলমান বিস্ফোরক মামলায় এখনও ১৬১ জন আটক রয়েছে। এদের অধিকাংশই পূর্বে হত্যাকাণ্ডের দোষী সাব্যস্ত হয়ে শাস্তি পেয়েছেন, তবে বিস্ফোরক মামলায় রায় না পাওয়ায় জেলে আটকে আছেন।
মোল্লা সাঈদ হোসেনের পরিবারে এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাঈদ, যিনি সৎকুমারী সাটখিরার এক প্রাক্তন সৈনিক, ২০০৯ সালের পিলখানা গুলিবিদ্ধ ঘটনার বিস্ফোরক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। যদিও তিনি হত্যাকাণ্ডের জন্য ১০ বছরের শাস্তি পেয়েছিলেন, যা সাত বছর আগে শেষ হয়েছে, তবু বিস্ফোরক মামলায় রায় না আসায় তিনি এখনও কারাগারে রয়েছেন।
সাঈদের বড় ভাই আবুল হাসান জানান, “আমার ভাইয়ের দশ বছরের শাস্তি শেষ হলেও, এখনো মুক্তি পাননি। আমাদের বয়স্ক বাবা-মা অসুস্থ, তারা প্রতিদিন তার ফিরে আসার অপেক্ষা করে।” তিনি আরও যোগ করেন, “সাঈদ ২০০৬ সালের মার্চে বডিআর স্পোর্টস ইউনিটে যোগ দেন, তখনই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হয়ে ওঠেন।”
সাঈদের সঙ্গে একই অবস্থায় আছেন আরও ১৬০ জন প্রাক্তন বডিআর সদস্য। উচ্চ আদালত ২০১৩ সালে ১৫৩ জনকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেয়, আর বাকি কয়েকজনকে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়। তবে বিস্ফোরক মামলায় রায় না আসায় তাদের মুক্তি এখনো বাধাগ্রস্ত।
বিচারিক রেকর্ড অনুযায়ী, এই ১৬১ জনের মধ্যে ১৫৩ জনকে উচ্চ আদালতে দশ বছরের শাস্তি আরোপ করা হয়। ২০১৩ সালে বাকি কয়েকজনকে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থেকে বাদ দেওয়া হয়। তবে বিস্ফোরক মামলায় এখনও কোনো রায় না হওয়ায়, তাদের জেল শর্তাবলী অব্যাহত রয়েছে।
মাকসুদুর রহমান, আরেকজন প্রাক্তন বডিআর ল্যান্স নায়ক, ১৬ বছর বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। তার হত্যাকাণ্ডের শাস্তি কয়েক বছর আগে শেষ হলেও, বিস্ফোরক মামলায় রায় না আসায় তিনি এখনও মুক্তি পাননি।
মাকসুদুরের স্ত্রী শারমিন আক্তার এই দীর্ঘ সময়ের কষ্টের কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “পিলখানা ঘটনার ধ্বংসাত্মক প্রভাব পুরো জাতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তবে আমার পরিবারের উপর এর প্রভাব অমাপযোগ্য। আমার স্বামী না থাকায় দুই সন্তানকে একা লালন-পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
শারমিনের কথায় স্পষ্ট হয় যে, তাদের সন্তানদের জীবনে পিতার অনুপস্থিতি কতটা বড় ক্ষতি সৃষ্টি করেছে। তিনি আরও যোগ করেন, “প্রতিদিন তার ফিরে আসার অপেক্ষা করি, কিন্তু সময়ের কোনো সাড়া নেই।”
আইনি বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বিস্ফোরক মামলাটি বর্তমানে ঢাকা ট্রাইব্যুনালের অধীনে রয়েছে, তবে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। মামলাটির জটিলতা এবং প্রমাণ সংগ্রহের সমস্যার কারণে রায়ের দেরি হচ্ছে।
প্রাসঙ্গিক আইনজীবীরা বলছেন, যদি উচ্চ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল দ্রুত রায় না দেয়, তবে এই বন্দীদের মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে এবং তাদের পরিবারকে আরও কষ্টের মুখে ফেলবে।
বডিআর বিস্ফোরক মামলায় জড়িতদের মুক্তি পেতে হলে আদালতের দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। বর্তমানে এই ১৬১ জনের অধিকাংশই ইতিমধ্যে তাদের মূল শাস্তি শেষ করে ফেলেছেন, তবু অতিরিক্ত মামলায় আটকে আছেন।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই মামলায় সংশ্লিষ্ট সকল প্রমাণ ও সাক্ষ্য এখনও সম্পূর্ণভাবে বিশ্লেষণাধীন। তবে কোনো নির্দিষ্ট তারিখে রায়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে না।
এই পরিস্থিতি দেশের মানবাধিকার সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের দৃষ্টিতে উদ্বেগের বিষয়। তারা দাবি করে, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করা উচিত, যাতে অবৈধভাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের মুক্তি নিশ্চিত করা যায়।
বডিআর বিস্ফোরক মামলায় জড়িতদের অবস্থা দেশের আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং মানবিক দিকের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী আটক এড়াতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার ও ত্বরিত রায়ের ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে।



