বাংলাদেশ জাত্রী কল্যাণ সমিতি গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, গত বছর রোড দুর্ঘটনা ও তার ফলে সৃষ্ট প্রাণহানি পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে মোট ৬,৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ৯,১১১ জনের প্রাণ নেওয়া হয়েছে এবং ১৪,৮১২ জন আহত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় মোট দুর্ঘটনার সংখ্যা ৬.৯৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, মৃত্যুর হার ৫.৭৯ শতাংশ এবং আহতের সংখ্যা ১৪.৮৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে, ২০২৪ সালে রেকর্ড করা হয়েছিল ৬,৩৫৯টি দুর্ঘটনা, ৮,৫৪৩ জনের মৃত্যু এবং ১২,৬০৮ জনের আঘাত।
ডেটা প্রকাশের সময় সমিতির সচিব সাধারণ মোজাম্মেল হক চৌধুরী উল্লেখ করেন যে, সরকার পরিবর্তনের পরেও রোড সেফটি সংক্রান্ত নীতি ও কাঠামোতে কোনো বাস্তবিক পরিবর্তন আনা হয়নি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ও মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সমস্যাগুলি আরও বাড়তে থাকে।
চৌধুরী আরও জানান যে, শহরের ট্রাফিক জ্যাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন সেবার ওপর অতিরিক্ত কর ও শুল্ক আরোপের ফলে যাত্রী ও মালামালের ভাড়া আবারো বাড়ছে। এই আর্থিক চাপের ফলে গাড়ি চালকদের মধ্যে অনিয়মের প্রবণতা বাড়ছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, “অস্থায়ী সরকার রোড ট্রান্সপোর্ট সেক্টরে সংস্কার না করলে, যাত্রীদের নিরাপত্তা, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন ভ্রমণের সমস্যাগুলি পরিবহন মালিকদের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।” এই বক্তব্যে তিনি বর্তমান নীতির অপ্রতুলতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি তুলে ধরেছেন।
সমিতির হিসাব অনুযায়ী, রোড দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ফলে দেশের অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। এই ক্ষতি সরাসরি চিকিৎসা ব্যয়, উৎপাদনশীলতার হ্রাস এবং মানবসম্পদ হ্রাসের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, “দুর্ঘটনা কমাতে এবং আর্থিক ক্ষতি রোধ করতে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় নীতি প্রয়োগ অপরিহার্য।” তিনি সরকারের কাছ থেকে রোড সেফটি সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন ও কার্যকরী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, রোড নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও ডেটার স্বচ্ছতা বাড়ানো জরুরি। এধরনের তথ্যের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে।
বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি সংগঠনও সমিতির এই ডেটা স্বীকার করে বলেছে যে, রোড নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন প্রয়োগের কঠোরতা এবং অবকাঠামো উন্নয়ন একসাথে করা দরকার।
অধিকন্তু, রোড দুর্ঘটনা কমাতে গাড়ি চালকদের প্রশিক্ষণ, সিটবেল্ট ও হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং রোডে অপ্রয়োজনীয় গতি সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
সমিতি আগামী মাসে একটি বিশেষ কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে সরকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে রোড সেফটি নীতি পুনর্বিবেচনা ও বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরি করা হবে।
এই সব প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হল, রোড দুর্ঘটনা হ্রাস করে মানবজীবন রক্ষা করা এবং দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমিয়ে আনা। ভবিষ্যতে রোড নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত কাজের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



