অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার রোববার, ৪ জানুয়ারি, টেলিফোনের মাধ্যমে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। উভয় পক্ষই এই সংলাপকে দুই দেশের কূটনৈতিক সংলাপের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
কলে উভয় দেশই বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের সহযোগিতা শক্তিশালী করার জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাবনা শেয়ার করেন। তৌহিদ হোসেন উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক কাঠামোকে আরও সম্প্রসারিত করতে চায়, আর ইসহাক দার পাকিস্তানের বিদ্যমান রপ্তানি পণ্য ও সেবা বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দেন।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক পর্যালোচনায় উভয় নেতা বর্তমান কূটনৈতিক, নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিকগুলোকে পুনরায় মূল্যায়ন করেন। তারা স্বীকার করেন যে অতীতের কিছু ঐতিহাসিক জটিলতা সত্ত্বেও, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তি দৃঢ় করা উভয় দেশের স্বার্থে। এ ধারা অনুসারে, ভবিষ্যতে উচ্চ পর্যায়ের সরকারি সফর, ব্যবসায়িক মিশন এবং একাডেমিক বিনিময়কে ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আলাপের সময় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, বিশেষ করে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক প্রবণতা নিয়ে মতবিনিময় হয়। উভয় পক্ষই উল্লেখ করেন যে এই অঞ্চলগুলোর পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি দু’দেশের কূটনৈতিক কৌশলে প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাই তথ্য শেয়ারিং ও সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। ইসহাক দার বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও এশিয়ার বাণিজ্যিক রুটের পুনর্গঠনকে গুরুত্ব দেন।
কলে উভয় সরকারই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য নিয়মিত টেলিফোনিক সংযোগ ও উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। তৌহিদ হোসেন বলেন, এই ধারাবাহিক সংলাপ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ রাখবে, আর ইসহাক দার যুক্তি দেন যে তা উভয় দেশের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ‑পাকিস্তান সম্পর্কের ঐতিহাসিক পটভূমি বিবেচনা করলে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উভয় দেশই বাণিজ্যিক পরিমাণ বাড়ানো, মানবিক সহায়তা ও শিক্ষামূলক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে। তৌহিদ হোসেনের উল্লেখে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে রপ্তানি-আমদানি ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি নতুন শিল্পখাতে প্রবেশের সম্ভাবনা দেখছে। ইসহাক দারও পাকিস্তানের শিল্প পণ্য, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও কৃষি পণ্যের জন্য বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচনা করছেন।
দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা ও সীমানা সংরক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা অন্তর্ভুক্ত। উভয় সরকারই এই বিষয়গুলোতে যৌথ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তৌহিদ হোসেন উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশে বন্যা ও সাইক্লোনের প্রভাব কমাতে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে চায়, আর ইসহাক দার পাকিস্তানের জলবায়ু অভিযোজন কৌশলকে বাংলাদেশের জন্য মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে, উভয় পক্ষই উচ্চ পর্যায়ের সরকারি সফর, বিশেষ করে মন্ত্রিপরিষদ স্তরের ভিজিটের সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছেন। তৌহিদ হোসেনের মতে, এই সফরগুলোতে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর, বিনিয়োগ প্রকল্পের আলোচনা এবং সংস্কৃতি বিনিময় প্রোগ্রামকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ইসহাক দারও পাকিস্তানের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিশেষ সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজনের কথা উল্লেখ করেছেন।
এই টেলিফোনিক সংলাপের মাধ্যমে উভয় দেশই পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার সংকল্প প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, এশিয়া‑প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উভয় দেশের কৌশলগত অবস্থান বিবেচনা করে, এই ধরনের উচ্চ পর্যায়ের সংলাপকে অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তৌহিদ হোসেন ও ইসহাক দার উভয়ই আশাবাদী যে, ধারাবাহিক সংলাপ ও সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ‑পাকিস্তান বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায় গড়ে উঠবে।



