যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার মার‑এ‑লাগো রিসোর্টে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলা অভিযানের মাধ্যমে তার “আমেরিকান ফার্স্ট” নীতি অগ্রসর হয়েছে। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে আর কখনো প্রশ্নের মুখে না আনার নিশ্চয়তা দেয়। ট্রাম্পের মতে, এই অভিযান “ডনরো মতবাদ”‑এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যা তিনি পূর্বের মনরো মতবাদের আধুনিক রূপ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
বিবিসি জানায়, ট্রাম্প “ডনরো মতবাদ” শব্দটি নিজ নাম ডোনাল্ড এবং ১৯শ শতাব্দীর যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর নীতির সংমিশ্রণ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। মনরো মতবাদ ১৮২৩ সালে ঘোষিত হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির পশ্চিম গোলার্ধে হস্তক্ষেপ রোধ করা এবং দুই আমেরিকান মহাদেশকে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে আলাদা রাখা। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
১৯০৪ সালে থিওডোর রুজভেল্ট, তখনকার প্রেসিডেন্ট, মনরো মতবাদের সীমা প্রসারিত করে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অনুমতি দেন, যদি কোনো দেশ তার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। এই সম্প্রসারণের ফলে হাইতি, নিকারাগুয়া এবং ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়। পরবর্তী দশকগুলোতে এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বিস্তারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
ট্রাম্পের নতুন রূপ “ডনরো মতবাদ” পূর্বের নীতির ধারাকে বজায় রেখে আরও কঠোর কৌশল প্রস্তাব করে। তিনি উল্লেখ করেন, এই নীতি লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যকে শক্তিশালী করবে এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা ক্ষেত্রে, ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে অঞ্চলীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা এই ঘোষণাকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন মোড় হিসেবে বিশ্লেষণ করছেন। তারা উল্লেখ করেন, “ডনরো মতবাদ” শব্দটি কেবল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং নয়, বরং পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুনর্গঠন ও বিস্তারের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। কিছু বিশ্লেষক পূর্বের মনরো নীতির তুলনায় এই নীতি অধিক সক্রিয় হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নির্দেশ করে, যা লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে সরাসরি হস্তক্ষেপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে, ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি পুনরায় সক্রিয় করা লাতিন আমেরিকান দেশগুলোর সরকার ও জনগণের মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ও চীনা শক্তিগুলোও পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি প্রভাবের প্রতি সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
ভবিষ্যতে “ডনরো মতবাদ” কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে পুনরায় মনরো নীতির পুনরাবৃত্তি ও আধুনিকীকরণ দেখা যাবে। লাতিন আমেরিকায় সম্ভাব্য সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা, পাশাপাশি অভিবাসন নীতি কঠোর করার ইঙ্গিত, অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিবিধিতে নতুন পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশও প্রভাবিত হতে পারে। ট্রাম্পের সমর্থকরা এই নীতি গ্রহণকে শক্তিশালী জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আর সমালোচকরা এটিকে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাই, “ডনরো মতবাদ” কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে মানানসই হবে, তা পরবর্তী মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের ঘোষিত “ডনরো মতবাদ” ভেনেজুয়েলা অভিযানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বাড়ানোর একটি নতুন কৌশল উপস্থাপন করে। এটি ঐতিহাসিক মনরো নীতির আধুনিক রূপ, যা লাতিন আমেরিকায় হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক চাপ এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্য রাখে। ভবিষ্যতে এই নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



