গণমাধ্যম কেন্দ্র, সচিবালয়, ঢাকা-এ রোববার (৪ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত বিএসআরএফ মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সরকারী অগ্রাধিকারের একটি নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। তিনি জানিয়ে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এক মাসের মধ্যে একটি সম্প্রচার ও সাংবাদিক সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে। এই আইন কার্যকর হলে সাংবাদিকরা কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবেন।
উল্লেখযোগ্য যে, এই উদ্যোগের পেছনে মিডিয়া স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রধান লক্ষ্য। রিজওয়ানা হাসান বলেন, বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হুমকি ও চাপ বাড়ছে, তাই আইনগত কাঠামো তৈরি করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি আরও যোগ করেন, নতুন অধ্যাদেশে প্রকাশনা স্বাধীনতা, তথ্যের স্বতন্ত্র প্রবাহ এবং সাংবাদিকদের শারীরিক সুরক্ষার ধারাগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
একই সময়ে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট লিগ (আইপিএল) সংক্রান্ত একটি বিষয়ও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আইপিএলের আইন উপদেষ্টা আইপিএলের সম্প্রচার বাংলাদেশে বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেন। রিজওয়ানা হাসান এই প্রস্তাবের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, যদি খেলাটিকে ক্রীড়া ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখা যেত, তবে তা ভালো হতো, তবে দুর্ভাগ্যবশত রাজনীতি এতে প্রবেশ করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, একবার বাংলাদেশি খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার পর, রাজনৈতিক যুক্তি ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত মতামতগুলো তাকে বাদ দেওয়ার দাবিতে পরিণত হয়েছে। এই ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে দেশের জনগণের মধ্যে আঘাতের অনুভূতি তৈরি হয়েছে এবং জনমতেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। রিজওয়ানা হাসান বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে এবং তা করার জন্য আইনগত ভিত্তি ও প্রক্রিয়া পুনরায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
আইপিএল সংক্রান্ত প্রস্তাবের পেছনে মূল যুক্তি হল, যদি খেলাটিকে রাজনৈতিক আলোচনার মঞ্চে না এনে ক্রীড়া হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তবে তা দেশের ক্রীড়া খাতের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপের কারণে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের সম্ভাবনা উত্থাপিত হয়েছে, যা ক্রীড়া প্রেমিক ও মিডিয়া উভয়েরই উদ্বেগের কারণ।
রিজওয়ানা হাসান উল্লেখ করেন, আইনগত দিক থেকে প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ শেষে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত সংগ্রহ করা হবে, যাতে সিদ্ধান্তটি ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ হয়।
সাংবাদিক সুরক্ষা সংক্রান্ত নতুন অধ্যাদেশের খসড়া তৈরির সময়সূচি এক মাসের মধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। এতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, মিডিয়ার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হবে। রিজওয়ানা হাসান জানান, এই বিধানগুলোতে হুমকি, আক্রমণ ও অনধিকারিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নির্ধারিত থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দেশের গণমাধ্যমের স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তারা উল্লেখ করেন, যদি নতুন আইন দ্রুত কার্যকর হয়, তবে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্কতা প্রকাশ করেছেন যে, আইন প্রণয়নের গতি ও বাস্তবায়নের মানদণ্ডে যথাযথ নজরদারি না হলে কাঠামোগত পরিবর্তন সীমিত থাকতে পারে।
আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের প্রস্তাবের বিরোধী দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রীড়া সংস্থা ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বলছে, এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ক্রীড়া শিল্পের আয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা দাবি করে, ক্রীড়া ও রাজনীতি আলাদা রাখার জন্য স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার ও দেশের ক্রীড়া খাতের উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন সাংবাদিক সুরক্ষা অধ্যাদেশের অনুমোদনের পর, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি তদারকি ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করবে। এই কমিটি আইনগত কাঠামো, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে।
সামগ্রিকভাবে, রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, সরকার মিডিয়া স্বাধীনতা ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে ন্যায়সঙ্গত নীতি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী। এক মাসের মধ্যে নতুন অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তুত করা এবং আইপিএল সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আইনগত পর্যালোচনা উভয়ই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। এই পদক্ষেপগুলো সফল হলে, গণমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন ও ক্রীড়া ন্যায়বিচার উভয়ই শক্তিশালী হবে।



