যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বিশাল সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গেছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, এই পদক্ষেপটি দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো একটি পররাষ্ট্র নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
ট্রাম্পের মতে, মাদুরোকে ‘অবৈধ শাসক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; তিনি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এবং মাদক পাচারসহ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত। এই অভিযোগের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের ন্যায়সঙ্গততা তুলে ধরেছেন।
ট্রাম্পের উল্লেখিত নীতি মূলত ১৮২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষিত ‘মনরো নীতি’। ঐ সময়ে মনরো ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আমেরিকান মহাদেশে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্কতা জানিয়ে বলেন, এমন কোনো হস্তক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
১৯০৪ সালে এই নীতি থিওডোর রুজভেল্টের ‘রুজভেল্ট করোলারি’ দ্বারা নতুন দিক পায়। ইউরোপীয় ঋণদাতারা লাতিন আমেরিকান দেশগুলোকে হুমকি দেওয়ার সময় রুজভেল্ট যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অধিকার ও দায়িত্ব ঘোষণা করেন। ফলে মনরো নীতি ও রুজভেল্ট করোলারি একত্রে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আইনি ভিত্তি গড়ে তোলে।
পরবর্তী দুই দশক ধরে এই নীতিগুলো বিভিন্ন লাতিন আমেরিকান দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রধান যুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ডোমিনিকান রিপাবলিক, হাইতি এবং নিকারাগুয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণকে এই নীতির অধীনে ন্যায়সঙ্গত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের বর্তমান পদক্ষেপে তিনি আবারও এই ঐতিহাসিক নীতিগুলোকে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার প্রশাসনের মতে, ভেনেজুয়েলায় কোনো বিদেশি শক্তি, যেমন রাশিয়া বা চীন, যদি প্রভাব বাড়ায়, তা মনরো নীতির বিরোধী হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে দক্ষিণ আমেরিকায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মাদুরো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে ট্রাম্পের দল ব্যাখ্যা করেছে।
ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের পর, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং মাদুরোর গ্রেফতার আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু বিশ্লেষক এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করছেন, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকরা এটিকে অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করছেন।
ট্রাম্পের প্রশাসন এই ঘটনাকে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন আমেরিকায় নীতি নির্ধারণের একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর, ভেনেজুয়েলায় নতুন রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
অধিকন্তু, ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি, ঋণ পুনর্গঠন এবং মানবিক সহায়তা প্রোগ্রামগুলোতে নতুন চ্যালেঞ্জ উদ্ভব হতে পারে।
এই ঘটনার পর, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের সংযোগ কীভাবে গড়ে উঠবে, তা আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজরে থাকবে। ট্রাম্পের দল ভবিষ্যতে একই নীতির ভিত্তিতে অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা অভিযানে ২০০ বছরের পুরোনো মনরো নীতি ও রুজভেল্ট করোলারির রেফারেন্স দিয়ে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে, এবং মাদুরোর গ্রেফতারকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অঞ্চলের স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও লাতিন আমেরিকান রাজনীতিতে কীভাবে প্রকাশ পাবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।



