মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা লক্ষ্য করে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রকৃত কারণ নিয়ে বিশ্লেষকদের নতুন মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের তেল‑দখল পরিকল্পনা নিয়ে অভিযোগ তুলছেন, আর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এই সন্দেহকে তীব্র করেছে। তেল‑বাজারের বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু লিপো, লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান, যুক্তি দেন যে সামরিক অভিযান মূলত তেল‑সম্পদের ওপর কেন্দ্রীভূত।
মাদুরো সম্প্রতি বারবার যুক্তি প্রকাশ করেছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন তার সরকারকে উখাত করার পরিকল্পনা করছে এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল‑সম্পদ নিজের হাতে নিতে চায়। এই দাবিগুলি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, এবং ট্রাম্পের নিজস্ব মন্তব্য পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। ট্রাম্পের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল‑কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে সমর্থন দিতে সেখানে প্রবেশ করবে, যা তেল‑সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াবে।
লিপো এই বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করে বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে সামরিক পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য তেল‑সম্পদ রক্ষা করা। তিনি যুক্তি দেন, “ট্রাম্পের কথা থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান সবকিছুই তেল‑সংক্রান্ত।” তদুপরি, লিপো মাদুরোর মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলা থেকে কতটুকু মাদক প্রবেশ করছে তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য নেই; কোকেনের উৎস কলম্বিয়া বা মেক্সিকো হতে পারে, আর ফেন্টানিলের রাসায়নিক সরবরাহ চীন থেকে আসতে পারে।
ভেনেজুয়েলার তেল‑খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে লিপো বিশদে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, প্রায় ত্রিশ বছর আগে দেশের দৈনিক তেল উৎপাদন ৩০ লাখ ব্যারেলের উপরে ছিল, কিন্তু এখন তা এক মিলিয়ন ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে। উৎপাদন সুবিধা ও অবকাঠামোর অবস্থা এতটাই দুর্বল যে, উৎপাদন বজায় রাখতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন। তবুও, উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে, যা তেল‑খাতের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
লিপো যুক্তি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে: ভেনেজুয়েলার তেল‑খাতে প্রয়োজনীয় বিশাল মূলধন কে সরবরাহ করবে, এবং তা কত দ্রুত করা সম্ভব হবে? তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতা পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই অনিশ্চয়তা তেল‑সম্পদের ওপর আন্তর্জাতিক আগ্রহকে জটিল করে তুলেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপে ভেনেজুয়েলায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক সংখ্যা এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে এই সংখ্যা সংঘাতের তীব্রতা নির্দেশ করে। হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট মানবিক ক্ষতি এবং তেল‑সম্পদের ওপর কেন্দ্রীভূত কৌশল উভয়ই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মুখে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি তেল‑সম্পদকে কেন্দ্র করে সামরিক পদক্ষেপ চালু থাকে, তবে তা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মাদুরোর সরকার তেল‑সম্পদ রক্ষা এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমর্থন খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল‑কোম্পানিগুলোর ভেনেজুয়েলা বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা তেল‑বাজারের গতি পরিবর্তন করতে পারে, যা গ্লোবাল তেল‑মূল্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলবে।
ভবিষ্যতে, ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তেল‑সম্পদ নিয়ে আলোচনার দিকনির্দেশনা আন্তর্জাতিক নীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়ে নির্ধারিত হবে। তেল‑খাতের পুনর্গঠন, বিনিয়োগের উৎস এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে, যাতে তেল‑সম্পদকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার পথ তৈরি হয়।



