মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার রাত (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর) ভেনেজুয়েলা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সামরিক আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। একই সময়ে তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়ে দেন এবং পরে মাদুরোকে হেলিকপ্টারে তুলে নেওয়ার তথ্য প্রকাশ করেন।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের পেছনে তিনি উল্লেখ করেন যে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা তার জন্য বাধা নয় এবং তিনি দ্রুত ও নির্ভীকভাবে তার পররাষ্ট্র নীতি বাস্তবায়ন করতে ইচ্ছুক। তিনি সামাজিক মাধ্যমের ৭৪ শব্দের পোস্টে এই সিদ্ধান্তের দ্রুততা ও দৃঢ়তা তুলে ধরেন।
ভেনেজুয়েলার সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ চালানোর পর, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মাদুরো ও তার স্ত্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ট্রাম্পের অফিসিয়াল বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে মাদুরোকে হেলিকপ্টারে তুলে নিয়ে গৃহে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যদিও গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
এই ঘটনাকে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পানামা আক্রমণ, যা ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ নামে পরিচিত, সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা সরকারগুলোকে অস্থির ও বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মাদুরো ও পানামার প্রাক্তন নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগা উভয়ই নির্বাচনী বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে ছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে মাদক পাচারসহ অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। উভয় দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে অপারেশন চালানোর পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
তবে দুই ঘটনার মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। নরিয়েগার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও পানামা সরকারের মধ্যে সীমান্ত পারাপার যুদ্ধের সূচনা হয়, যেখানে নরিয়েগা কোনো চুক্তি স্বীকার না করে প্রতিরোধ করেন। পানামার জাতীয় পরিষদ তাকে সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়।
এর পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ডিসেম্বর ১৯৮৯-এ ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ শুরু করে, যার লক্ষ্য নরিয়েগাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া। নরিয়েগা ভেনেজুয়েলায় হেলিকপ্টার দিয়ে নেওয়ার মতো নয়; তিনি পানামা সিটির ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নেন এবং আত্মগোপন করার চেষ্টা করেন।
১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে নরিয়েগা শেষমেশ আত্মসমর্পণ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরিত হন। তার পরপরই তাকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যেখানে হত্যাকাণ্ড, মাদক পাচার ও অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ ও মাদুরোর গ্রেপ্তারকে আন্তর্জাতিক আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছে, তবে প্রেসিডেন্টের মতে তা তার জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রয়োজনীয়। একই সঙ্গে, এই পদক্ষেপের ফলে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নেওয়া হয়েছে, তবে এর ফলে অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে পারে। মাদুরোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান ও তার সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকবে।
অপরদিকে, নরিয়েগার অপারেশন থেকে শিখা পাঠগুলো এখনো লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। নরিয়েগার গ্রেপ্তার ও পরবর্তী শাস্তি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার বিষয়ও রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপের পরবর্তী ধাপগুলো এখনও স্পষ্ট নয়। ভেনেজুয়েলার সরকার কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, মাদুরোর গ্রেপ্তার কীভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা সময়ের সাথে প্রকাশ পাবে।



