গত রাত্রি গুলশান এলাকায় বিএনপি-র অফিসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের একটি আটজনের দল উপস্থিত হয়ে বিএনপি কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান তারিক রহমানের সঙ্গে এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের বৈঠক পরিচালনা করে। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারিত হিংসা ও সহিংসতার উদ্বেগ তুলে ধরা এবং আসন্ন নির্বাচনের ম্যানিফেস্টোতে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চাওয়া।
বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিরা সাম্প্রতিক ঘটনার বিশদ বিবরণ উপস্থাপন করে, যা তারা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এধরনের পরিস্থিতি ভোটারদের আস্থা ক্ষয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, এ কথাও তারা জোর দেন।
প্রতিনিধিরা আটটি নির্দিষ্ট দাবির তালিকা প্রস্তুত করে তা তারিকের সামনে উপস্থাপন করে। এই তালিকায় আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, ধর্মীয় স্থানের সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সমান সুযোগ, এবং নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্টভাবে সংখ্যালঘু অধিকার সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়েছে। তারা এই দাবিগুলোকে পার্টির নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দৃঢ় আহ্বান জানায়।
তারিক রহমান এই দাবিগুলো শোনার পর আইন ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, এ কথা পুনরায় জোর দেন। তিনি বলেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সকল নাগরিকের ধর্ম বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে সক্ষম হতে হবে। এছাড়া, তিনি সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সমষ্টিগত প্রচেষ্টার গুরুত্ব উল্লেখ করেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পূজা উদযাপন পরিষদ সভাপতি বসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কার্যনির্বাহী সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ, প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ, আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, ধাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি চিত্র রঞ্জন মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক ডি.এন. চ্যাটার্জি এবং মেট্রোপলিটন সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক তাপস চন্দ্র পাল।
বিএনপি সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং সংখ্যালঘু নেতাদের উদ্বেগ শোনার পর পার্টির নীতি নির্ধারণে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈঠকের সময় সংখ্যালঘু নেতারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোক প্রকাশ করে, তারিক রহমানের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে পৃথক সমবেদনা বার্তা হস্তান্তর করেন। এই শোক প্রকাশের মাধ্যমে তারা পার্টির সঙ্গে ঐতিহাসিক সংযোগ ও পারস্পরিক সমর্থনের ইঙ্গিতও প্রদান করে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই ধরনের চাহিদা এবং তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইচ্ছা আগামী নির্বাচনে ভোটের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে। ম্যানিফেস্টোতে স্পষ্টভাবে সংখ্যালঘু অধিকার সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত হলে, বিএনপি সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন অর্জনে সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে, যদি এই দাবিগুলো উপেক্ষা করা হয়, তবে পার্টি ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে পারে, যা রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন গতিবিদ্যা তৈরি করতে পারে।
বৈঠকের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, সংখ্যালঘু নেতারা তাদের আটটি দাবির তালিকা পার্টির নীতি প্রস্তুতকারী কমিটিতে জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং ম্যানিফেস্টোর খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগে অতিরিক্ত আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে, তারা নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন্ত জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৎক্ষণাত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।
এই বৈঠকটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক চাহিদা ও নিরাপত্তা উদ্বেগকে কেন্দ্রীয় করে একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ তৈরি করেছে, যা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে। ভবিষ্যতে ম্যানিফেস্টোতে এই দাবিগুলোর অন্তর্ভুক্তি এবং বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা দেশের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে থাকবে।



