মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট ডেল্টা ফোর্সের একটি দল লাতিন আমেরিকার ভেনেজুয়েলা দেশে আক্রমণ চালিয়ে রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া অ্যাডেলা ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করেছে। ক্যারাকাসসহ মিরান্ডা, আরাগুয়া এবং লা গুইয়ারা রাজ্য জুড়ে একাধিক হামলার পর এই ধরা পড়া ঘটেছে, যা আজ শনিবারের মধ্যাহ্নে প্রকাশিত হয়।
ডেল্টা ফোর্সের এই অভিযান সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিবিসির যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক অংশীদার সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন যে, দলটি পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় প্রবেশ করে দুজনকে নিরাপদে তুলে নিয়েছে। ডেল্টা ফোর্সকে মার্কিন সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এই ধরনের অপারেশন তার বিশেষায়িত ক্ষমতার প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একই দিনে নিজের সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘ট্রুথ স্যোশাল’ এ পোস্ট করে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় বড় মাত্রার সফল আক্রমণ চালিয়েছে এবং মাদুরো ও তার স্ত্রীর গ্রেপ্তার নিশ্চিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই অভিযানটি যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে পরিচালিত হয়েছে এবং আজ বিকেল ১১ টায় মার-এ-লাগোতে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
ভেনেজুয়েলা সরকার এই ঘটনার পর একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একাধিক রাজ্যে বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানোর অভিযোগ তুলেছে। সরকার এটিকে সরাসরি ‘সামরিক আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যকে দেশের তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
কাতারভিত্তিক আল জাজিরা সংস্থা জানায় যে, ক্যারাকাসের পাশাপাশি মিরান্ডা, আরাগুয়া এবং লা গুইয়ারা রাজ্যেও একই ধরনের আক্রমণ ঘটেছে। এই অঞ্চলে বিস্তৃত হামলা ও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়, যা ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা কাঠামোকে বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ক্যারাকাসের সরকারী মুখপাত্র যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এ ধরনের আক্রমণ আমাদের সার্বভৌমত্বের সরাসরি লঙ্ঘন এবং তা কোনোভাবে সফল হবে না।” এই বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে মাদুরো সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, যা দেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ও শাসন ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলবে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ক্যারাকাসে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার কিছুক্ষণ আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) ভেনেজুয়েলার বাণিজ্যিক বিমানগুলোর জন্য আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। FAA এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘চলমান সামরিক তৎপরতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা আকাশপথে চলাচলকে কঠিন করে তুলেছে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। মাদুরোর জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম তীব্র হবে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে মানবিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে, ট্রাম্পের পরিকল্পিত সংবাদ সম্মেলন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বিশদ ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যৎ নীতির দিকনির্দেশনা প্রকাশের সুযোগ হবে।
ভেনেজুয়েলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করে, এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে, ডেল্টা ফোর্সের এই অপারেশনকে সন্ত্রাসবিরোধী ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তবে ভেনেজুয়েলার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরবর্তী কয়েক দিন থেকে উভয় দেশের সরকারী মুখপাত্রের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার বিশ্লেষণ এবং কূটনৈতিক নোটিশের মাধ্যমে এই সংকটের প্রকৃত দিক ও সম্ভাব্য সমাধান নির্ধারিত হবে। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপের সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এই ঘটনাকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃশ্যপটে কীভাবে প্রভাবিত করবে তা নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হবে।



