জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সৈয়দা নীলিমা দোলা ৩ জানুয়ারি ফেসবুকে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে দল থেকে পদত্যাগের ইচ্ছা জানিয়ে এনসিপির সব দায়িত্ব ও পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি দলকে ‘পূর্ণ ডানপন্থী’ ধারায় ঢুকে পড়া এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গোপন জোট গড়ে তোলার অভিযোগ তুলে দলের নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
নীলিমা দোলা পদত্যাগপত্রের একটি কপি দলের আহ্বায়ক, সদস্য সচিব এবং মূল দপ্তরে পাঠিয়েছেন। তার চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, এনসিপি মধ্যমার্জিত রাজনীতির পথ থেকে সরে সম্পূর্ণ ডানপন্থী রঙে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এখন এমন রাজনীতিকদের সমর্থন দিচ্ছে, যাদের তিনি ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
দোলা আরও বলেন, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী জোট কোনো কৌশলগত সহযোগিতা নয়, বরং দলের নেতাকর্মীদের চোখে ধুলো দিয়ে গড়ে তোলা একটি কৌশল। তিনি যুক্তি দেন, এই জোটের মাধ্যমে মনোনয়নের নামেই ভোটারকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে এবং দলটি যারা ত্যাগ করছেন তাদের ‘বামপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা একটি ‘গেম প্ল্যান’ হিসেবে কাজ করছে।
ফেসবুক পোস্টে নীলিমা দোলা উল্লেখ করেন, এনসিপিতে যোগদানের আগে ও পরে তিনি নিজের প্রগতিশীল মানসিকতা বজায় রেখেছেন এবং তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার ও পরিচিতি দলের শক্তি বৃদ্ধি করেছে, তবে দল তাকে কোনো বাস্তব ক্ষমতা প্রদান করেনি। তিনি জুলাই ২০২৪-এ গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে এনসিপির বর্তমান অবস্থাকে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানি হিসেবে দেখেন। দোলা জোর দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে কোনো ধর্মীয় বিপ্লব বা অভ্যুত্থান ঘটেনি; তবু এনসিপি এই ঘটনাকে ধর্মীয় মোড়ে ঘুরিয়ে ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
চিঠির শেষাংশে তিনি এনসিপি নেতৃত্বকে ‘লাল সালাম’ জানিয়ে, দলের জনগণের প্রতি দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং ভবিষ্যতে জনগণ দলের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করবে বলে উল্লেখ করেন।
এনসিপি ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটের ঘোষণা করলেও, ঐ ঘোষণার আগে থেকেই কেন্দ্রীয় নেতারা জোটের বিরোধে পদত্যাগ শুরু করেন। তাসনিম জারা (সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব) ও তাজনূভা জাবীন (যুগ্ম আহ্বায়ক) সহ অন্তত দশজন নেতা দল ছেড়েছেন। এই পদত্যাগগুলো জোটের প্রতি অভ্যন্তরীণ বিরোধের সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দোলার পদত্যাগ এবং সাম্প্রতিক নেতাদের প্রস্থানের ফলে এনসিপির অভ্যন্তরে বিভাজন বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি দল গোপন জোটের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করে এবং ডানপন্থী রূপান্তরের অভিযোগগুলো সমাধান না করে, তবে আরও সদস্যদের ত্যাগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে, জামায়াতের সঙ্গে জোটের বৈধতা ও রাজনৈতিক প্রভাবও প্রশ্নের মুখে পড়বে, বিশেষ করে ভোটারদের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী সংবেদনশীলতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে।
এনসিপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। তবে দলটি আগামী সপ্তাহে তার কৌশলগত দিকনির্দেশনা ও জোটের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ সভা আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সভা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পার্টির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং নির্বাচনী প্রভাব নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে।
সৈয়দা নীলিমা দোলার পদত্যাগ এবং তার প্রকাশিত অভিযোগগুলো এনসিপির অভ্যন্তরীণ গঠন ও জোটের নীতি সম্পর্কে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। পার্টি কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে এবং ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।



