অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বেশ কয়েকটি জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা ঘোষণা করেছে। এ পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য ছিল কিছু ঐতিহাসিক অংশকে বাদ দিয়ে নতুন বিষয়বস্তু সংযোজন করা। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ কিছু সংস্করণ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে জুলাই আন্দোলন সম্পর্কিত নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) গত বছর ২৮ ডিসেম্বর অনলাইন সংস্করণ প্রকাশের পর থেকে এই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ এবং সাধারণ পাঠকরা পরিবর্তনগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এনসিটিবি পরে প্রকাশিত আপডেটেড সংস্করণে এই পরিবর্তনগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে। ফলে সংশোধনের পরিধি এবং প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সহজলভ্য হয়েছে।
বদল করা সংস্করণগুলোতে ৭ মার্চের ভাষণের মূল অংশ সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, আর জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীকে নতুন অধ্যায় হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। নতুন পাঠে ১৯৪৩ সালের আন্দোলনের সূচনা, প্রধান নেতা-সেনাপতি এবং আন্দোলনের ফলাফল বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বে ভাষণের মাধ্যমে শেখ মুজিবের স্বাধীনতা সংগ্রামের দৃষ্টিভঙ্গি আর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ প্রদান করতে পারে।
‘বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়’ বইয়ের বিভিন্ন সংস্করণে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও কিছু সংস্করণে এখনও এই শব্দটি রয়ে গেছে। উপাধি বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে এনসিটিবি অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গৌরবের উল্লেখ কমাতে চেয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন কিছু পাঠকের মধ্যে ঐতিহাসিক পরিচয়ের ক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বইয়ের এই অংশে কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উচ্চ মাধ্যমিক ইংরেজি পাঠ্যবইতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পাঠ্যাংশ সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। তার পরিবর্তে জুলাই আন্দোলন সংক্রান্ত নতুন এক পাঠ যোগ করা হয়েছে, যা মূলত ১৯৪৩ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনের বিশ্লেষণ প্রদান করে। নতুন পাঠে ঐ সময়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে ইংরেজি শিক্ষার্থীরা এখন ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাথে ভাষা দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয় পাবে।
এধরনের পরিবর্তন ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইতেও দেখা গেছে। প্রাথমিক স্তরে ইতিহাসের মূল কাঠামো বজায় রাখতে কিছু অংশ পুনর্লিখন করা হয়েছে, তবে মূল বিষয়বস্তুতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বইতে পূর্বে ১২টি গদ্যাংশের মধ্যে ৭ মার্চের ভাষণ একটি অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। নতুন সংস্করণে গদ্যাংশের সংখ্যা ১১-এ কমিয়ে ওই অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সাল পর্যন্ত ‘সাহিত্য কণিকা’ বইতে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতো। এই গদ্যাংশটি শিক্ষার্থীদের জাতীয় গর্ব ও আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে কাজ করত। তবে বর্তমান সংস্করণে ঐ গদ্যাংশের পরিবর্তে অন্য ঐতিহাসিক উদাহরণ যুক্ত করা হয়েছে, যা মূলত জুলাই আন্দোলনের দিকে মনোযোগ দেয়। ফলে শিক্ষার্থীরা এখন স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিবর্তে অন্য একটি আন্দোলনের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস শিখবে।
আগস্ট ৫, ২০২৪-এ ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক সংশোধন আনা হয়। এই আন্দোলনের ফলে শিক্ষাব্যবস্থার কিছু অংশে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গৌরবের উল্লেখ কমাতে চাওয়া হয়। সংশোধনের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে লিখিত অনুরোধ পাঠানো হয়। এরপর এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনগুলো কার্যকর করে।
মাউশি কর্তৃক পাঠানো চিঠিতে শেখ মুজিবের অতিরঞ্জিত তথ্য বাদ দেওয়ার প্রস্তাব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের সঠিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ধরনের সমন্বয় জরুরি। এনসিটিবি চিঠির ভিত্তিতে সংশোধন পরিকল্পনা তৈরি করে এবং সংশ্লিষ্ট বইগুলোতে তা প্রয়োগ করে। ফলে নতুন সংস্করণে ঐতিহাসিক তথ্যের উপস্থাপনায় পরিবর্তন দেখা যায়।
এই পরিবর্তনগুলো প্রকাশের পর থেকে শিক্ষাবিদ, ইতিহাস গবেষক এবং সাধারণ পাঠকরা বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে ৭ মার্চের ভাষণ জাতীয় গর্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষক বলেন যে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু আপডেট করা দরকার যাতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিখতে পারে। এনসিটিবি এখনও এই বিতর্কের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে পরিবর্তনগুলো ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি স্কুলে বাস্তবায়িত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো কী অর্থ বহন করে তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পাঠ্যবইতে যুক্ত করা জুলাই আন্দোলনের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে। তবে ৭ মার্চের ভাষণ বাদ যাওয়ায় স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল বার্তা কিছুটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই শিক্ষক ও অভিভাবকদের উচিত নতুন পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ব্যাখ্যা প্রদান করা।
আপনার সন্তান বা শিক্ষার্থীরা যদি এই নতুন পাঠ্যবই ব্যবহার করে থাকে, তবে তাদের সঙ্গে আলোচনা করুন যে কীভাবে ইতিহাসের বিভিন্ন দিক একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। প্রশ্ন করুন, “যদি ৭ মার্চের ভাষণ না থাকে, তবে স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল চেতনা কীভাবে প্রকাশ পায়?” এ ধরনের প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।



