সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা উপর আক্রমণ চালায় এবং দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করার অভিযোগে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই ঘটনা ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসের নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১৯৫৪ সালের ২৭ জুন গুয়াতেমালায় তখনকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকোবো আরবেঞ্জ গুজমানকে মার্কিন অর্থায়িত ও প্রশিক্ষিত সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্ষমতাচ্যুত করে। তার ভূমি সংস্কার নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বড় ফল কোম্পানি ইউনাইটেড ফ্রুট কর্পোরেশনের স্বার্থকে হুমকি দেয়।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ গুজমানের উচ্ছেদে সরাসরি ভূমিকা নিয়েছে স্বীকার করে, যা শীতল যুদ্ধের সময় কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
১৯৬১ সালের ১৫ থেকে ১৯ এপ্রিল সিআইএ প্রশিক্ষিত ১,৪০০ অ্যান্টি-কার্সা যোদ্ধা কিউবার বে অফ পিগসের উপকূলে অবতরণ করার চেষ্টা করে, তবে ফিদেল কার্সোর শাসন উল্টাতে ব্যর্থ হয়। এই সংঘাতে উভয় পক্ষের প্রায় একশো করে মানুষ প্রাণ হারায়।
১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন ও প্যারাট্রুপাররা ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের সান্তো ডোমিঙ্গোতে প্রবেশ করে, যেখানে জুয়ান বশের সমর্থক একটি বিদ্রোহ দমন করা হয়। সরকার তখনই ‘কমিউনিস্ট হুমকি’ উল্লেখ করে সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায়সঙ্গত করে।
শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটি প্রাচীর হিসেবে বিভিন্ন সামরিক শাসনকে সমর্থন করে। চিলিতে ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্যালভাদর আলেন্ডের সরকার পতনের পর অগাস্টো পিনোচেটের সামরিক শাসনকে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা পাওয়া যায়।
১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার আর্জেন্টাইন জুয়ান্তাকে সমর্থন জানিয়ে ‘ডার্টি ওয়ার’ দ্রুত শেষ করার পরামর্শ দেন। ২০০৩ সালে গোপন নথি প্রকাশে দেখা যায়, এই সমর্থন শাসনের মানবাধিকার লঙ্ঘনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আর্জেন্টিনায় ১০,০০০ এর বেশি রাজনৈতিক বিরোধী নিখোঁজ হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নথিতে উল্লেখিত। এই সময়ে অপারেশন কন্ডর নামে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা চালু হয়, যেখানে আর্জেন্টিনা, চিলি, উরুগুয়ে, পারাগুয়ে, বলিভিয়া ও ব্রাজিল একত্রে বামপন্থী বিরোধীকে নির্মূল করার চেষ্টা করে।
অপারেশন কন্ডরের কার্যক্রমে বহু রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী লক্ষ্যবস্তু হয়, যা ল্যাটিন আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবাধিকার সংকটের দিকে নিয়ে যায়।
এইসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নীতি প্রায়ই ‘কমিউনিস্ট হুমকি’কে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, তবে বাস্তবে তা অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা আক্রমণেও একই ধরনের কৌশল দেখা যায়: সামরিক শক্তি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে হস্তক্ষেপ করা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকার এই ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী হস্তক্ষেপের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে অঞ্চলীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতিতে গভীর প্রভাব পড়েছে। বহু দেশ এখন অতীতের হস্তক্ষেপের পরিণতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলন প্রক্রিয়া চালু করেছে।
এই ইতিহাসের আলোকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নীতি ও ল্যাটিন আমেরিকায় তার ভূমিকা নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে, যাতে অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি না হয়।



