গত সপ্তাহে বাংলাদেশে ব্যবসা ও আর্থিক বাজারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখা গিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ব্যক্তিগত আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ আবার এক মাস বাড়িয়ে জানুয়ারি ৩১ নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের মর্জের ফলে তাদের জমা সম্পদ সমিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তরের কাজ আগামী সপ্তাহে সম্পন্ন হবে। তদুপরি, দেশীয় সুতো শিল্পের মালিকরা ভারতের থেকে সুতো আমদানি ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ জানিয়েছেন, যা স্থানীয় উৎপাদনের তুলনায় কম দামে বিক্রি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। আর স্বর্ণের দাম স্থানীয় বাজারে প্রতি ভোরি ২,২৯,৪৩০ টাকায় নতুন শীর্ষে পৌঁছেছে, যা আন্তর্জাতিক মূল্যের উত্থান এবং নিরাপদ সম্পদ হিসেবে চাহিদা বৃদ্ধির ফল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ২৮ ডিসেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে যে, ব্যক্তিগত করদাতাদের জন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ পূর্বে নির্ধারিত ২৮ ডিসেম্বর থেকে এক মাস বাড়িয়ে জানুয়ারি ৩১ করা হয়েছে। এটি পূর্বের এক্সটেনশনকে অনুসরণ করে, যা করদাতাদের আর্থিক চাপ কমাতে এবং সময়মতো রিটার্ন দাখিলের হার বাড়াতে লক্ষ্য রাখে। এই পদক্ষেপের ফলে কর সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় সাময়িক বিলম্ব হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছতা ও সম্মতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২৭ ডিসেম্বর জানিয়েছে যে, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের মর্জের ফলে তাদের গ্রাহকদের জমা সম্পদ সমিলিত ইসলামী ব্যাংকে এক সপ্তাহের মধ্যে স্থানান্তর করা হবে। স্থানান্তরের সময় গ্রাহকদের বিদ্যমান চেক ব্যবহার করে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের অনুমতি থাকবে, এবং বর্তমান সুদের হার বজায় থাকবে। এই ব্যবস্থা মর্জের সময় গ্রাহকের আস্থা রক্ষা এবং তহবিলের প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সুতো শিল্পের প্রতিনিধিরা ২৮ ডিসেম্বর জানিয়েছেন যে, ভারতের থেকে সুতো আমদানি গত বছর তুলনায় ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা দাবি করছেন যে, এই আমদানি দেশীয় উৎপাদনের তুলনায় কম দামে বিক্রি হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ সৃষ্টি করে এবং বহু মিলকে অপ্রচলিত মজুদ ও আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলেছে। বিশাল পরিমাণে অমিল মজুদ এবং উৎপাদন বন্ধের ফলে শিল্পের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়তে পারে।
স্বর্ণের দাম ২৮ ডিসেম্বর স্থানীয় বাজারে প্রতি ভোরি ২,২৯,৪৩০ টাকায় নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক বুলিয়ন মূল্যের উত্থান এবং নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধিই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গহনা ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করেছেন যে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিদেশে সুদের হার হ্রাসের প্রত্যাশা এবং মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠা-নামা স্বর্ণের মূল্যে প্রভাব ফেলছে, যা গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা ও বিনিয়োগের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করছে।
এই চারটি প্রধান বিষয়ের সমন্বয় ব্যবসা ও আর্থিক বাজারে একাধিক প্রভাব ফেলবে। কর ফাইলিং সময়সীমা বাড়ানো করদাতাদের আর্থিক পরিকল্পনা সহজ করবে, তবে রাজস্ব সংগ্রহে সাময়িক বিলম্বের ঝুঁকি থাকবে। ব্যাংক মর্জের মাধ্যমে সম্পদ একত্রিকরণ আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে, তবে গ্রাহকের আস্থা বজায় রাখতে দ্রুত ও স্বচ্ছ স্থানান্তর প্রক্রিয়া প্রয়োজন। সুতো আমদানি বৃদ্ধির ফলে দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ বাড়বে, যা স্থানীয় শিল্পের পুনর্গঠন ও রপ্তানি কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। স্বর্ণের রেকর্ডমূল্য বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কাজ করবে, তবে মুদ্রা ও সুদের হার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণের দামের অস্থিরতা বাড়তে পারে।
ভবিষ্যতে কর ফাইলিং সময়সীমা পুনরায় বাড়ানোর সম্ভাবনা, মর্জের ফলে ব্যাংক সেক্টরের কাঠামোগত পরিবর্তন, সুতো শিল্পের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বর্ণের দামের আন্তর্জাতিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই পরিবর্তনগুলো ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগের দিকনির্দেশনা এবং নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে, তাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।



