সুইজারল্যান্ডের ক্র্যান্স-মন্টানা রিসোর্টে নতুন বছরের প্রথম দিনেই একটি বার অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ৪০ জনের মৃত্যু এবং ১১৯ জনের আঘাতের খবর প্রকাশিত হয়েছে। বারটি “ল কনস্টেলেশন” নামে পরিচিত এবং অগ্নি শিকড়ে পৌঁছেছে বেসমেন্টে, যেখানে স্পার্কলারসহ শ্যাম্পেনের বোতলগুলো ছাদে খুব কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে। এই বিপর্যয়ের ফলে বহু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা একসাথে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজদের মধ্যে যুক্তরাজ্যে শিক্ষা গ্রহণকারী এক কিশোরীও অন্তর্ভুক্ত, যার নাম চার্লট নিডডাম। তিনি হের্টফোর্ডশায়ার অবস্থিত ইমানুয়েল কলেজ এবং লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত জিউইশ ফ্রি স্কুলে (JFS) পড়াশোনা করেছেন। JFS তার দুই বছর শিক্ষার সময় তাকে খুবই প্রিয় ছিলেন এবং পরিবার ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার পরও তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। স্কুলটি তার নিরাপত্তা ও সুস্থতার জন্য প্রার্থনা ও সমর্থনের আহ্বান জানায়। ইমানুয়েল কলেজও একইভাবে পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে এবং চার্লটের জন্য এক আশীর্বাদপূর্ণ সমাধানের প্রার্থনা করে।
ক্র্যান্স-মন্টানার পর্যটন সাইটের তথ্য অনুযায়ী, চার্লট ছুটির সময় রিসোর্টে বেবিসিটার হিসেবে কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় বারটি নতুন বছরের উদযাপনে ভিড় ছিল, যেখানে সুইস নাগরিক ও বিদেশি পর্যটক উভয়ই উপস্থিত ছিলেন। অগ্নি শিখা দ্রুত ছাদে ছড়িয়ে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যে পুরো কাঠামোকে গ্রাস করে, ফলে তৎক্ষণাৎ উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি।
সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট গাই পারমেলিন এই ঘটনার পর “দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ট্র্যাজেডি” বলে মন্তব্য করেন। তিনি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ রোধের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। ভ্যালাইসের অ্যাটর্নি জেনারেল বেট্রিস পিলৌড জানান, তদন্তে বারটির নির্মাণ সামগ্রী, অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ক্ষমতা এবং ঘটনার সময় উপস্থিত মানুষের সংখ্যা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হবে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাহুল দাসের মতে, এই ধরনের অগ্নিকাণ্ডের পেছনে প্রায়শই নিরাপত্তা মানদণ্ডের অবহেলা এবং পর্যটন শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, “সুইজারল্যান্ডের মতো উচ্চমানের পর্যটন গন্তব্যে অগ্নি নিরাপত্তা প্রোটোকলকে আরও কঠোর করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ বিপর্যয় রোধ করা যায়।” এছাড়াও, তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে নিরাপত্তা মানদণ্ডের সমন্বয় এবং তথ্য শেয়ারিংয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ১১৩ জন আহতকে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে বাকি ছয়জনের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। স্বাস্থ্যের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সীমিত থাকলেও, আহতদের মধ্যে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবক ও মেডিকেল টিমের সমন্বয়ে আহতদের ত্রাণ কাজ দ্রুততর করা হচ্ছে।
সুইস কর্তৃপক্ষের মতে, শিকারের পরিপূর্ণ তালিকা প্রকাশে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, কারণ দেহের অবশিষ্টাংশের শনাক্তকরণে আধুনিক ফরেনসিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে, পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন মানসিক সহায়তা প্রদান করছে।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রভাবও স্পষ্ট। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা কমিটি ইতিমধ্যে এই ঘটনার পর্যালোচনা শুরু করেছে এবং ভবিষ্যতে পর্যটন সাইটে অগ্নি নিরাপত্তা মানদণ্ডকে একত্রিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এছাড়া, যুক্তরাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিদেশে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নির্দেশিকা প্রণয়নের কথা বিবেচনা করছে।
সারসংক্ষেপে, ক্র্যান্স-মন্টানা রিসোর্টের বার অগ্নিকাণ্ডে একাধিক প্রাণহানি, আঘাত এবং নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে যুক্তরাজ্যে শিক্ষা গ্রহণকারী চার্লট নিডডামও অন্তর্ভুক্ত। সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই দুর্যোগের পরিণতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নিরাপত্তা মানদণ্ডকে শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করছে।



