৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ঢাকা শহরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা উদ্বোধন করা হয়েছে। দুই দিনের দেরি সত্ত্বেও, মেলাটি দেশের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রদর্শনী হিসেবে শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য দেশীয় উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং নতুন উদ্ভাবনকে সমর্থন করা।
মেলাটি ঢাকা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্রের প্রধান হলগুলোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং তিন দিনের জন্য চলবে। এতে দেশীয় ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করে পণ্য, সেবা এবং প্রযুক্তি প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মেলার সূচি অনুযায়ী, প্রতিদিন বিভিন্ন সেমিনার ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে শিল্প বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেবেন।
বাণিজ্য মেলার অন্যতম প্রধান অংশীদার হল বাংলাদেশ-জাপান ইন্টারন্যাশনাল পার্টনারশিপ এক্সচেঞ্জ (IPE)। IPE মেলার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং জাপানি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে বাংলাদেশে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। এই সহযোগিতা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মেলায় তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, টেক্সটাইল, রসায়ন, ইলেকট্রনিক্স এবং নবায়নযোগ্য শক্তি সহ বিভিন্ন সেক্টরের স্টল স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে স্টার্টআপ এবং মাঝারি আকারের উদ্যোগগুলোকে নতুন পণ্য ও সেবা প্রদর্শনের জন্য আলাদা জোন বরাদ্দ করা হয়েছে। এতে স্থানীয় উদ্ভাবকদের আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীর সঙ্গে সরাসরি সংযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারের দৃষ্টিতে, এই মেলা দেশের রপ্তানি ভিত্তি বিস্তৃত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মেলার মাধ্যমে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায়। এছাড়া, মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর সুবিধা ও রপ্তানি সহায়তা প্যাকেজের তথ্যও প্রদান করা হবে।
একজন উপদেষ্টা মেলাটিকে “দেশের নতুন উদ্যোগ, উদ্ভাবন-উন্নয়নের প্রদর্শনী” হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, মেলাটি কেবল পণ্য প্রদর্শনের মঞ্চ নয়, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্ঞান শেয়ারিং এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এই দৃষ্টিভঙ্গি মেলার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মেলাটি স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য নতুন বাজার উন্মুক্ত করবে। রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, দেশীয় শিল্পের মানোন্নয়ন ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া, মেলায় প্রদর্শিত নতুন প্রযুক্তি ও পণ্যগুলো স্থানীয় সরবরাহ শৃঙ্খলকে আধুনিকায়ন করতে সহায়তা করবে।
ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) গুলোর জন্য মেলাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মেলার বিশেষ জোনে তারা বিনিয়োগকারী, ক্রেতা এবং ভেন্ডরদের সঙ্গে সরাসরি মিটিং করতে পারবে। ফলে, আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তি লাইসেন্স এবং বাজার প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। এই ধরনের সংযোগ SME গুলোর স্কেল আপ করার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
বিদেশি বিনিয়োগের দিক থেকে, মেলাটি জাপানসহ অন্যান্য দেশের ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের আকৃষ্ট করেছে। IPE এর মাধ্যমে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে উৎপাদন ইউনিট স্থাপন বা যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছে। এ ধরনের বিনিয়োগ দেশের শিল্প কাঠামোকে বৈচিত্র্যময় করবে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখবে।
তবে, মেলার সফলতা নিশ্চিত করতে কিছু চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক মানের মানদণ্ডে পণ্য গুণমান নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, লজিস্টিক্স ও শিপিং সিস্টেমের দক্ষতা বাড়াতে হবে যাতে রপ্তানি প্রক্রিয়া দ্রুত হয়। তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য স্বচ্ছ নীতি ও নিয়মাবলী প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, এই বাণিজ্য মেলা দেশের বাণিজ্যিক কৌশলের একটি মূল স্তম্ভে পরিণত হতে পারে। মেলার মাধ্যমে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্ক এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা পরবর্তী বছরের মেলাগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। যদি মেলাটি প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করে, তবে এটি দেশের রপ্তানি কাঠামোকে পুনর্গঠন এবং উচ্চমূল্য যুক্ত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সারসংক্ষেপে, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা দেশের নতুন উদ্যোগ হিসেবে উদ্ভাবন ও উন্নয়নের মঞ্চ তৈরি করেছে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বয়ে এই মেলা বাণিজ্যিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।



