সুইজারল্যান্ডের ভ্যালাইস প্রদেশের একটি স্কি রিসোর্টে অবস্থিত বারে রাতের বেলা অগ্নিকাণ্ড ঘটার ফলে ৪০ জনের মৃত্যু এবং ১১৯ জনের আঘাত নিশ্চিত হয়েছে। ঘটনাটি নতুন বছরের প্রথম রাতে, প্রায় রাত একটায় ঘটেছে এবং স্থানীয় জরুরি সেবা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। বারের ভিতরে উপস্থিত লোকজনের সঠিক সংখ্যা এখনও নির্ধারণ করা হচ্ছে, তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি তদন্তের মূল বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই স্বাস্থ্যের দায়িত্বে থাকা হাসপাতালগুলোতে আহতদের তীব্র চিকিৎসা প্রদান করা হয়। বর্তমানে ১১৩ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, বাকি ছয়জনের পরিচয় নির্ধারণে কাজ চলছে। আহতদের মধ্যে গুরুতর পোড়া, শ্বাসকষ্ট এবং শারীরিক আঘাতের মিশ্রণ রয়েছে, যা স্থানীয় চিকিৎসা সংস্থার উপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।
সুইস ফেডারেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মৃত ও আহতদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নিতে পারে। তদন্তের আওতায় অগ্নিকাণ্ডে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, বারের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ধারণক্ষমতা এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষের সংখ্যা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিশদভাবে পরীক্ষা করা হবে।
বারের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কারণ ঘটনাস্থলে যথাযথ অ্যালার্ম ও জরুরি বেরিয়ে আসার পথের অভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভ্যালাইসের অ্যাটর্নি জেনারেল বিয়াত্রিস পিলো উল্লেখ করেছেন, তদন্তে এই সব দিকের বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অগ্নিকাণ্ডের ফলে বহু পরিবার গভীর শোক ও উদ্বেগে ডুবে আছে, বিশেষ করে দুইটি তরুণের পরিবার যারা এখনও নিখোঁজ। ১৬ বছর বয়সী সুইস নাগরিক আর্থার ব্রডার্ডের মা লায়েটিসিয়া জানান, তার ছেলে ঘটনার পর ৩০ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলেও এখনও কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। তিনি এবং স্বামী লোজান বিভিন্ন হাসপাতাল ও বার্ন ইউনিটে গিয়ে সন্তানকে খুঁজেছেন, তবে কোনো ফলাফল অর্জন করতে পারেননি।
লায়েটিসিয়া উল্লেখ করেন, আর্থারের কয়েকজন বন্ধুর দেহের অর্ধেক অংশই পুড়ে গিয়েছে, যা তাদের জন্য অস্বীকারযোগ্য কষ্টের চিহ্ন। তিনি বলেন, এই যন্ত্রণাকে শব্দে প্রকাশ করা কঠিন, তবে পরিবারকে শুধু সন্তানের সন্ধানই দরকার, অন্য কিছু নয়।
অন্যদিকে, ১৬ বছর বয়সী ইতালীয় নাগরিক আচিল ওসভালদো জিওভান্নি বারোসি নতুন বছরের রাতের দেরি সময় বারে প্রবেশ করে, তার জ্যাকেট ও মোবাইল ফোন নিয়ে। তার পর থেকে তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তার খালা ফ্রান্সেসকা, একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সেবার মাধ্যমে জানিয়েছেন, তার ভাতিজা মিলানের একটি আর্ট স্কুলে পড়ত এবং চিত্রশিল্পে দক্ষ ছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরিবার এখনো তার নিরাপদ ফিরে আসা প্রত্যাশা করছে।
ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের ছয়জন নাগরিক এই ঘটনার ফলে নিখোঁজ অবস্থায় রয়েছে। মন্ত্রণালয় ইতালীয় নাগরিকদের জন্য কনসুলার সহায়তা প্রদান করছে এবং সুইস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য সংগ্রহে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ধরনের বড় আকারের অগ্নিকাণ্ডে কনসুলার সেবা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা নীতি বিশেষজ্ঞ ড. মার্টিন গ্যাব্রিয়েল উল্লেখ করেন, “সুইস ও ইতালীয় কর্তৃপক্ষের দ্রুত সমন্বয় ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্যোগে মানবিক সহায়তা বাড়াতে পারে।” তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনার পর কনসুলার সেবা ও তথ্য শেয়ারিং প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
সুইস ফেডারেল পুলিশ ইতিমধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও রেকর্ড, সাক্ষ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্তে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে, স্থানীয় জরুরি সেবা ও স্বেচ্ছাসেবক দলগুলো আহতদের ত্রাণে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বড় সংখ্যক আহত ও মৃতের পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই ধরনের দুর্যোগে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে এবং সুইস সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন পরিকল্পনা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে।
সুইস সরকার ইতোমধ্যে অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব কমাতে জরুরি তহবিল বরাদ্দ করেছে এবং ভবিষ্যতে বারের অগ্নি-নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোর করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। ভ্যালাইসের ক্যান্তন কর্তৃপক্ষও পর্যটন শিল্পের নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন নির্দেশিকা তৈরি করার কথা জানিয়েছে।
পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে, সুইস ফেডারেল পর্যটন সংস্থা (STB) অস্থায়ীভাবে বারের কার্যক্রম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং পুনরায় খোলার আগে নিরাপত্তা পরিদর্শন সম্পন্ন হবে। এই পদক্ষেপটি পর্যটন শিল্পের সুনাম রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বলে ধরা হচ্ছে।
অবশেষে, পরিবারগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্যের জন্য আবেদন জানাচ্ছে এবং কোনো সূত্র পাওয়া গেলে তা শেয়ার করতে অনুরোধ করছে। নিখোঁজ তরুণদের সন্ধানে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও সহায়তা প্রদান করতে প্রস্তুত। এই ঘটনাটি সুইস ও ইতালীয় কনসুলার সেবার সমন্বিত কাজের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় তুলে ধরেছে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্যোগে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।



