ইউএন মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুটেরেস শুক্রবার গাজা অঞ্চলে মানবিক সংস্থার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তৎক্ষণাৎ প্রত্যাহার করার জন্য ইসরায়েলকে আহ্বান জানিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে আন্তর্জাতিক অ-সরকারি সংস্থাগুলি প্রাণরক্ষাকারী কাজের জন্য অপরিহার্য এবং বর্তমান নিষেধাজ্ঞা সাময়িক অস্ত্রবিরতির সময় অর্জিত অল্প অগ্রগতিকে ক্ষুন্ন করতে পারে।
গুটেরেসের মুখপাত্র স্টেফান দুজারিকের মতে, এই পদক্ষেপ গাজা অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের মানবিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তিনি যুক্তি দেন যে নিষেধাজ্ঞা মানবিক সহায়তার প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে এবং বেসামরিক জনগণের দুর্ভোগ বাড়ায়।
ইসরায়েল বৃহস্পতিবার ৩৭টি বিদেশি মানবিক সংস্থাকে গাজা স্ট্রিপে প্রবেশের অনুমতি থেকে বাদ দেয়। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (MSF) অন্তর্ভুক্ত, যার গাজা ও পশ্চিম তীরের এলাকায় প্রায় ১,২০০ কর্মী নিয়োজিত। অধিকাংশ কর্মী গাজায় কাজ করছেন।
নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত সংস্থাগুলিকে ১ মার্চের মধ্যে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়সীমা সংস্থাগুলোর জন্য অত্যন্ত সংকটজনক, কারণ তারা ইতোমধ্যে চলমান মানবিক জরুরি অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদান করে আসছে।
বহু সংস্থা দাবি করে যে কর্মী তালিকা প্রকাশের দাবি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন এবং তাদের স্বতন্ত্রতা ও নিরপেক্ষতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। তারা বলেন, এমন শর্ত পূরণ করা তাদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়ায়।
ইসরায়েল সরকার এই নতুন নিয়মকে এমন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করার উপায় হিসেবে উপস্থাপন করে, যেগুলোকে তারা সন্ত্রাসবাদের সহায়তা করে বলে সন্দেহ করে। সরকার দাবি করে যে এই ব্যবস্থা গাজা অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখতে অপরিহার্য।
ইসরায়েলের ১৮টি বামপন্থী সংস্থা এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে উল্লেখ করেছে যে নতুন নিবন্ধন কাঠামো মানবিক নীতির মৌলিক নীতি—স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা—উলংঘন করে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই পদক্ষেপের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে।
অক্টোবর থেকে গাজা ও ইসরায়েল সীমিত অস্ত্রবিরাম বজায় রেখেছে, যা হামাসের ৭ অক্টোবরের আক্রমণের পর গৃহীত হয়। যদিও যুদ্ধের তীব্রতা কমে এসেছে, তবু মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির।
নভেম্বর মাসে গাজা কর্তৃপক্ষ জানায় যে যুদ্ধের শুরুর পর থেকে ৭০,০০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দ্বারা স্বীকৃত এবং মানবিক সংকটের তীব্রতা তুলে ধরে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা মৌলিক অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। বিদ্যুৎ, পানি ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, ফলে বেঁচে থাকা জনগণের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গাজার দুই মিলিয়নের বেশি বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ তাদের বাড়ি হারিয়েছেন, যা মানবিক জরুরি অবস্থার মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছে। তহবিল ও সম্পদের অভাবে পুনর্নির্মাণ কাজ ধীরগতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদে গাজা পরিস্থিতি ও মানবিক সহায়তার প্রবাহ রোধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা প্রত্যাশিত। গুটেরেসের আহ্বান আন্তর্জাতিক নীতি ও মানবিক নীতির মধ্যে সমন্বয় রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে মানবিক সংস্থার কার্যক্রমে বাধা গাজা অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ, রোগের বিস্তার এবং বেসামরিক মৃত্যুর হার বাড়াতে পারে। তারা জোর দিয়ে বলেন যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত পদক্ষেপ গাজার মানবিক সংকটকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে অপরিহার্য।
গুটেরেসের বার্তা স্পষ্ট: গাজায় মানবিক সংস্থার কাজ অব্যাহত রাখা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বাধ্যতামূলক, এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা হলে মানবিক দুর্ভোগ বাড়বে। এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য কূটনৈতিক চাপ ও মানবিক সহায়তার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



