সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শনিবার রিয়াদে একটি সমন্বিত সংলাপের জন্য সকল দক্ষিণি গোষ্ঠীকে একত্রিত করার আহ্বান জানায়। এই উদ্যোগের পেছনে সাম্প্রতিক বোমা হামলা ও দক্ষিণি গোষ্ঠীর স্বতন্ত্রতা দাবি করা একটি অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট রয়েছে। রিয়াদে অনুষ্ঠিত হবে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্মেলন, যেখানে দক্ষিণি স্বার্থের ন্যায়সঙ্গত সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে, এবং ইয়েমেনের সরকারই এই আমন্ত্রণ জানিয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বহু বছর ধরে ইয়েমেনের সরকার-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন করে আসছে, এবং দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে উভয় দেশই সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। এই দুই দেশের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থিত দক্ষিণান্তরীয় কাউন্সিল (STC) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ তারা এখন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে, যা আরব উপদ্বীপের সবচেয়ে দরিদ্র দেশকে দুই ভাগে ভাগ করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
STC সাম্প্রতিক সপ্তাহে বিস্তৃত এলাকা দখল করে এবং দুই বছরের একটি পরিবর্তনকালীন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে দক্ষিণে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করা হবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, দক্ষিণি অঞ্চলগুলোকে ধাপে ধাপে স্বশাসন প্রদান করা হবে, তবে এখনো কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়নি।
গত শুক্রবার, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বোমা হামলায় ২০ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর মতে ঘটেছে। এই আক্রমণটি দক্ষিণে চলমান সংঘাতের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এখনও উত্তরে শক্তি বজায় রেখেছে, আর সৌদি-সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো দক্ষিণে একে অপরের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন, “রিয়াদে অনুষ্ঠিত সংলাপ সকল দক্ষিণি গোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপদ মঞ্চ তৈরি করবে, যেখানে আমরা যৌথভাবে স্থিতিশীলতা ও শান্তির পথ খুঁজে বের করতে পারি।” তিনি আরও যোগ করেন যে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ গঠন নিয়ে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রিয়াদে সংলাপের আহ্বান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত, যা ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমাধানে নতুন দিকনির্দেশনা নির্দেশ করে। তবে তারা সতর্ক করছেন যে, সংলাপের সাফল্য নির্ভর করবে সকল পক্ষের ইচ্ছাশক্তি ও বাস্তবিক পদক্ষেপের উপর, বিশেষ করে STC-র স্বতন্ত্রতা দাবি এবং হুথি গোষ্ঠীর অবস্থান।
ইয়েমেনের সরকার, যা সৌদি-সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন পায়, ইতিমধ্যে রিয়াদে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং আশা প্রকাশ করেছে যে, এই আলোচনার মাধ্যমে দক্ষিণি গোষ্ঠীর সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়া গড়ে তোলা যাবে। সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, সংলাপের মূল লক্ষ্য হল দক্ষিণি স্বার্থের ন্যায়সঙ্গত সমাধান খুঁজে বের করা এবং দেশের ঐক্য রক্ষা করা।
এই মুহূর্তে, দক্ষিণি গোষ্ঠীর মধ্যে একাধিক ফ্যাকশন রয়েছে, যারা বিভিন্ন মাত্রার স্বতন্ত্রতা ও স্বশাসন চায়। STC ছাড়াও, কিছু গোষ্ঠী হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যা অঞ্চলের জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, রিয়াদে সংলাপের ফলাফল যদি সফল হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও তার পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে। অন্যদিকে, ব্যর্থতা হলে সংঘাতের তীব্রতা বাড়তে পারে এবং মানবিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সৌদি-সংযুক্ত আরব আমিরাতের জোট ২০১৫ সালে গঠিত হয়েছিল, মূল উদ্দেশ্য ছিল হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে উত্তরের থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া। দশ বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের পরেও হুথি গোষ্ঠী এখনও উত্তরাঞ্চলে শক্তি বজায় রেখেছে, আর দক্ষিণে সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
সংলাপের পরবর্তী ধাপ হিসেবে রিয়াদে একটি পূর্ণাঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সকল দক্ষিণি গোষ্ঠীকে একত্রিত করে সমাধানের পথ নির্ধারণ করা হবে। এই সম্মেলনের সময়সূচি ও অংশগ্রহণকারীর তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে আশা করা হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ গঠন ও শান্তি প্রক্রিয়া এখন রিয়াদে সংলাপের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে এই উদ্যোগটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



