আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা গত কয়েক মাসে প্রায় দুই হাজার নাগরিককে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। এই পদক্ষেপে ১৯৫০ সালের একটি পুরনো আইন ব্যবহার করা হয়েছে, যা পূর্বে সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রণীত ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশি ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক কোনো ব্যক্তিকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে পুশ ব্যাক করা হবে।
বিশ্বশর্মা জানান, উচ্চতর আদালতে আপিলের মাধ্যমে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তির অবস্থান স্থায়ী না রাখতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন। তারা জোর দিয়ে বলছেন, ১৯৫০ সালের আইনটি স্বাধীন ভারতের বিশেষ পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল এবং আজকের সময়ে তা প্রয়োগ করা যায় না।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবীও এই আইনটির সংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার কথা ভাবছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আইনটি তখনই প্রণয়ন করা হয়েছিল যখন দেশভাগের পর অভিবাসনের জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে প্রয়োজনীয়তা দেখা গিয়েছিল। এখন একই প্রেক্ষাপট না থাকায় তা অসাংবিধানিক হতে পারে।
মন্তব্যে তিনি বলেন, ৩১ ডিসেম্বর তারিখে ১৮ জনকে পুশ ব্যাক করা হয়েছে এবং এদের মধ্যে বেশিরভাগই ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এই চিহ্নিতকরণের পরে কীভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হবে, তা নিয়ে আগে কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা ছিল না।
পূর্বে বিদেশি হিসেবে ধরা ব্যক্তিদের আটক শিবিরে রাখা হতো, তবে তারা প্রায়শই জামিনে মুক্তি পেয়ে যাচ্ছিল। বর্তমান নীতিতে কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নয়, শুধুমাত্র পুশ ব্যাককে নতুন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
১৯৫০ সালের আইনটি ১ মার্চ, ১৯৫০ তারিখে গৃহীত হয়েছিল এবং তার শিরোনাম ছিল ‘অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) নির্দেশ, ১৯৫০’। যদিও এটি আসাম থেকে বহিষ্কারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, তবে আইনের ধারা অনুযায়ী পুরো ভারতের জন্যই প্রযোজ্য বলে উল্লেখ আছে।
আইনটি নির্দিষ্ট করে দেয় যে বহিষ্কারের আদেশে কোন তারিখের মধ্যে এবং কোন পথ দিয়ে ফিরে যেতে হবে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এই শর্তগুলো বর্তমানে পুশ ব্যাকের প্রক্রিয়ায় পূরণ করা হচ্ছে।
আইনজীবীরা যুক্তি দেন, এই আইনটি তখনই প্রয়োজনীয় ছিল যখন দেশভাগের পর বড় পরিমাণে অভিবাসন ঘটছিল। আজকের সময়ে এটি নিয়মিত বিতাড়নের স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করা সংবিধানিক নীতির বিরোধী।
গুয়াহাটি হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক ভুঁইয়া বলেন, ১৯৫০ সালের এই আইনের ব্যবহার এখন অসাংবিধানিক হতে পারে এবং এর পেছনে বহু কারণ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, আইনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, যা এখন দীর্ঘমেয়াদী নীতি হিসেবে চালিয়ে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।
বৈধতা নিয়ে চলমান বিতর্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আসাম সরকার এই পদক্ষেপকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নতুন কৌশল হিসেবে উপস্থাপন করছে, তবে বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি কঠোর সমালোচনা জানাচ্ছে।
আসাম সরকারের মতে, পুশ ব্যাকের মাধ্যমে অবৈধভাবে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের দ্রুত দেশ থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব, যা দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক। অন্যদিকে, আইনি বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে উচ্চতর আদালতে দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াই হতে পারে।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রায় দুই হাজার ব্যক্তি এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। সরকার দাবি করে, ভবিষ্যতে একই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে চালু করা হবে।
বৈধতা ও মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া না পর্যন্ত, পুশ ব্যাকের নীতি কীভাবে বিকশিত হবে তা অনিশ্চিত রয়ে গেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখায়, আসাম সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে নতুন আইনি সরঞ্জাম ব্যবহার করে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ইচ্ছুক।
এই বিষয়টি নিয়ে আসন্ন আদালতের রায় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি দেশের অভিবাসন নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। উভয় দিকের মতামত ও আইনি যুক্তি পরস্পর বিরোধপূর্ণ হওয়ায়, পরবর্তী কয়েক মাসে বিষয়টি কীভাবে সমাধান হবে তা নজরে থাকবে।



