মুদ্রাস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় সরকার এই বছর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন হার ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী ছয় মাসের জন্য প্রযোজ্য থাকবে। এই পরিবর্তন বিনিয়োগকারী ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উভয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে।
দ্রুত বাড়তে থাকা মূল্যের গতি দেশের মুদ্রা বাজারে ৮-৯ শতাংশের মধ্যে স্থায়ী হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক মাসে মুদ্রাস্ফীতি সামান্য কমেছে, তবু তা এখনও গৃহস্থালির ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্রের রিটার্ন কমে যাওয়া মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক ভারকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সরকার ছয় মাস পরপর সঞ্চয়পত্রের রিটার্ন রিভিউ করে থাকে। শেষবারের মতো ১ জানুয়ারি আর্থিক বিভাগ (ইআরডি) নতুন সুদের কাঠামো প্রকাশ করেছে, যা আগামী ছয় মাসের জন্য স্থায়ী হবে। এই রিভিউ প্রক্রিয়া বিনিয়োগের স্বচ্ছতা ও বাজারের চাহিদা মেটাতে নিয়মিত করা হয়।
নতুন হারে সর্বোচ্চ রিটার্ন ১০.৫৯ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন রিটার্ন ৮.৭৪ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। তুলনামূলকভাবে, গত বছরের শেষার্ধে সর্বোচ্চ রিটার্ন ১১.৯৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন রিটার্ন ৯.৭২ শতাংশ ছিল। ফলে গড়ে প্রায় এক শতাংশের হ্রাস ঘটেছে।
এই হ্রাসের সরাসরি প্রভাব দেখা যায় যখন ১ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা হয়। পূর্বের রেটে মাসিক মুনাফা প্রায় ২২০ টাকা ছিল, এখন তা ১১০ টাকা কমে গেছে, অর্থাৎ বছরে মোট মুনাফা ১,৩২০ টাকা হ্রাস পাবে।
বড় পরিমাণে বিনিয়োগকারী এই পরিবর্তনে আরও বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হবে। উদাহরণস্বরূপ, ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে বার্ষিক মুনাফা প্রায় ৬,৬০০ টাকা কমে যাবে। এই হ্রাস দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চয় পরিকল্পনা ও অবসর সঞ্চয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে।
সঞ্চয়পত্রের চারটি প্রধান ধরণ রয়েছে: পাঁচ বছরের মেয়াদী সঞ্চয়পত্র, তিন মাসে একবার মুনাফা প্রদানকারী সঞ্চয়পত্র, পেনশন সঞ্চয়পত্র এবং পরিবার সঞ্চয়পত্র। এ ছাড়াও চারটি সঞ্চয় বন্ড এবং পোস্ট অফিসে তিনটি পণ্য উপলব্ধ।
পরিবার সঞ্চয়পত্র সর্বাধিক জনপ্রিয়, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে উচ্চ রিটার্ন এবং নমনীয় মেয়াদ প্রদান করে। পূর্বে এই পণ্যের রেট ১১.৯৩ শতাংশ ছিল, যা এখন ১০.৫৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে একই মূলধনে পূর্বের তুলনায় কম মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সঞ্চয়পত্রের মুনাফা একটি গুরুত্বপূর্ণ আয় উৎস। পরিবারের দৈনন্দিন খরচের একটি অংশ এই মুনাফা থেকে আসে, তাই রেট কমে যাওয়া তাদের আর্থিক পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলবে। বিশেষ করে যারা বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি সামলাতে সংগ্রাম করছেন, তাদের জন্য এই পরিবর্তন অতিরিক্ত চাপের কারণ।
সরকারের মূল যুক্তি হল ঋণ সেবার খরচে সামান্য হ্রাস আনা। সঞ্চয়পত্রের সুদ কমলে সরকারী ঋণের উপর সুদ ব্যয় কমে, যদিও এই সঞ্চয়ী হ্রাসের পরিমাণ মোট বাজেটের তুলনায় সীমিত। তবু এটি আর্থিক দায়িত্বের একটি অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এই সিদ্ধান্তের প্রতি কিছু সমালোচনা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, মুদ্রাস্ফীতি কমার আগে সুদ কমিয়ে বিনিয়োগকারীর আয় কমানো কি সঠিক পদক্ষেপ। তবে সরকার দাবি করে যে, দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ভবিষ্যতে সুদের হার পুনরায় সমন্বয় করা হতে পারে, বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি এবং বাজেট ঘাটতির পরিবর্তন অনুযায়ী। বিনিয়োগকারীদের জন্য এখনই সুদের হ্রাসের প্রভাব মূল্যায়ন করে, বিকল্প সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পণ্য বিবেচনা করা জরুরি। সংক্ষেপে, সঞ্চয়পত্রের রেট কমে মধ্যবিত্তের মুনাফা হ্রাস পাবে, আর সরকার ঋণ ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে আর্থিক ভার সামলাতে চাচ্ছে।



