শীতের প্রথম হিমশীতল দিনে, নিউ ইয়র্ক সিটিতে হাজারো সমর্থক ও প্রগতিশীল ডেমোক্রেটিক জোটের সামনে ৩৪ বছর বয়সী মেয়র জোহরান মামদানি তার শপথ গ্রহণের পর “শহরের নতুন গল্প” বলার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে দিলেন। তিনি বলেন, “সিটি হলের কাজ হবে নিরাপত্তা, সাশ্রয়ীতা এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা, যেখানে সরকার জনগণের মতোই কাজ করবে এবং তাদের সঙ্গে থাকবে।” এই বক্তব্যই তাকে নভেম্বর ২০২৫-এ অপ্রত্যাশিত জয় এনে দেয়।
মামদানির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সার্বজনীন শৈশবকালীন যত্ন, বিনামূল্যে পাবলিক বাস সেবা এবং শহর পরিচালিত মুদি দোকান চালু করা। এছাড়া তিনি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা, বিশেষ করে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত আবাসনের ভাড়া স্থবির রাখা এবং সবার জন্য বিনামূল্যে শৈশবকালীন যত্ন নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।
নিউ ইয়র্কের বিশাল ও জটিল নগর কাঠামোর মধ্যে এসব নীতি বাস্তবায়ন সহজ নয়। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও জননীতি অধ্যাপক প্যাট্রিক এগান উল্লেখ করেন, “মামদানি তার সব রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ব্যবহার করে এসব লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করবেন, তবে নিউ ইয়র্কের আকার ও জটিলতা বিবেচনা করলে ফলাফল অনিশ্চিত।” তিনি আরও বলেন, শহরের বিভিন্ন স্বার্থধারী গোষ্ঠীর সমর্থন ছাড়া এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
মামদানির কিছু নীতি তুলনামূলকভাবে কম খরচে বাস্তবায়নযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, ভাড়া স্থবির করার জন্য তিনি শহরের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে সমর্থনশীল সদস্য নিয়োগ করতে পারেন, যা সরাসরি নীতি পরিবর্তনে সহায়তা করবে। তবে বৃহত্তর আর্থিক ব্যয় প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো, যেমন বিনামূল্যে বাস সেবা ও সার্বজনীন শৈশবকালীন যত্ন, বাজেটের ঘাটতির কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ও জননীতি অধ্যাপক রবার্ট শাপিরো বলেন, “বিনামূল্যে বাস ও শৈশবকালীন যত্নের মতো সেবা চালু করতে বড় আর্থিক ব্যয় দরকার, এবং বর্তমান রাজ্য ও শহরের বাজেট ঘাটতি এই পরিকল্পনাগুলোকে কঠিন করে তুলছে।” তিনি উল্লেখ করেন, রাজ্য ও শহরের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এই ধরনের সামাজিক সেবা সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
মেয়রের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হল তার নীতিগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহের উপায় নির্ধারণ। বর্তমান আর্থিক সংকটের মধ্যে, নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান সম্পদের পুনর্বিন্যাস ছাড়া অতিরিক্ত তহবিল সৃষ্টির উপায় সীমিত। তাই, মামদানিকে বাজেটের অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করে, সম্ভব হলে ফেডারেল অনুদান বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের পথ অনুসন্ধান করতে হবে।
শহরের রাজনৈতিক পরিবেশে মেয়রের স্বতন্ত্র নীতি বাস্তবায়নের জন্য অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদারদের সমর্থন জরুরি। নিউ ইয়র্কের সিটি কাউন্সিল, রাজ্য সরকার এবং শ্রমিক ইউনিয়নগুলোকে তার পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। বিশেষ করে, পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন অথরিটি এবং শিক্ষা বিভাগে তার নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সহযোগিতা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।
মামদানির প্রথম পূর্ণ কর্মদিবসে তিনি ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সূচনা করেছেন। ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে নতুন সদস্য নিয়োগের মাধ্যমে তিনি ভাড়া স্থবির করার পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তবে বিনামূল্যে বাস সেবা ও সার্বজনীন শৈশবকালীন যত্নের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল নিশ্চিত করা এখনো বাকি।
বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্যতে মামদানির নীতি বাস্তবায়নের পথে কয়েকটি মূল পর্যায়ের প্রত্যাশা করছেন। প্রথমে, তিনি তার নীতি অগ্রাধিকারগুলোকে বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে একটি স্পষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন। এরপর, সিটি কাউন্সিলের অনুমোদন পেয়ে আইনগত কাঠামো গড়ে তুলবেন। শেষমেশ, ফেডারেল ও রাজ্য স্তরে সমর্থন অর্জন করে তহবিলের ঘাটতি পূরণ করবেন। এই ধাপগুলো সফল হলে, নিউ ইয়র্কের সামাজিক সেবা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
মামদানির স্বপ্নময় নীতি ও বাস্তবিক আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে তার শাসনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যদি তিনি সফলভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করেন, তবে নিউ ইয়র্কের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে একটি নতুন মডেল স্থাপন করতে পারেন। অন্যথায়, উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা শহরের রাজনৈতিক ও আর্থিক পরিবেশে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।



