জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রতি বছর মার্চ‑এপ্রিলের আগে পাঠ্যবই প্রকাশে ব্যর্থ হয়, ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছায় না। এই দেরি ১৫ বছর ধারাবাহিকভাবে চলেছে এবং প্রতিবারই গাইড বই বিক্রেতাদের জন্য লাভের সুযোগ তৈরি করে। অনুমান করা হয়, এই দেরির ফলে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার অবৈধ গাইড বই ব্যবসা চালু থাকে।
বাজারে গাইড বইয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ লেকচার পাবলিকেশন করে। এই প্রকাশনা সংস্থা গাইড ও নোটের উৎপাদন, বিতরণ এবং বিক্রয় সবই এক হাতে নিয়ন্ত্রণ করে। গাইড বইয়ের চাহিদা বাড়াতে শিক্ষা বিভাগে কাজ করা পাঁচশো অধিক কর্মকর্তা গোপনে মাসিক বেতন পেয়ে নোটবই লেখার কাজ করেন। এই কর্মীদের মাধ্যমে গাইডের বিষয়বস্তু দ্রুত প্রস্তুত হয় এবং প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বিক্রয় বাড়ানো হয়।
বছরের শেষের দিকে গাইড বইয়ের বিক্রয় বাড়াতে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিশন ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় পাঁচশো কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে বলে জানা যায়। গাইড বইয়ের বিক্রয় বাড়ানোর জন্য এই ধরনের আর্থিক প্রণোদনা ব্যবহার করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের আর্থিক বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
একজন মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ও তার অভিভাবক (নাম প্রকাশ না করা শর্তে) জানান, ক্লাসে প্রকাশনা সংস্থার নির্দিষ্ট তালিকা দেওয়া হয় এবং সেই তালিকায় থাকা নোট, গাইড, ব্যাকরণ ও গ্রামার বই কিনতে বাধ্য করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বিকল্প থাকে না; নির্দিষ্ট প্রকাশকের গাইড বই কেনা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, যা পরিবারে বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
২০০৮ সালে হাইকোর্টের একটি আদেশে নোট ও গাইড বই নিষিদ্ধ করা হয়। আইন অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড আরোপ করা হতে পারে। তবে, নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও নোট‑গাইডের রমরমা ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণিতে “একের ভেতর সব” শিরোনামে গাইড বইগুলোকে “সহায়ক বই” বা “অনুশীলনমূলক বই” নামে পুনঃব্র্যান্ড করা হয় এবং বাজারে বিক্রি করা হয়।
এ ধরনের গাইড বইয়ের উৎপাদন ও বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর গাইড বই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এনসিটিবির এক শ্রেণির কর্মকর্তারা গোপন বৈঠক করেন। বৈঠকে আলোচনা হয় কীভাবে পাঠ্যবই দেরি হলে গাইডের চাহিদা বাড়বে এবং গাইড বইকে দ্রুত বাজারে ছাড়তে হবে।
বিশেষত, নতুন পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি ফাঁস হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাণ্ডুলিপি ফাঁস হলে গাইড প্রকাশনা সংস্থা দ্রুত নোটের রূপে তা প্রস্তুত করে এবং পাঠ্যবইয়ের আসার আগেই বাজারে ছড়িয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় এনসিটিবির এক শ্রেণির অসদাচরণকারী কর্মকর্তা গাইডের সিডি (মুদ্রণের কপি), নম্বর বণ্টন ও সিলিংয়ের কাজেও জড়িত ছিলেন।
গাইড বইয়ের এই অবৈধ ব্যবসা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল মেধা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদিও আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবু বাস্তবায়নের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণের ফলে ব্যবসা চালু রয়েছে।
শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নে পাঠ্যবইয়ের সময়মতো প্রকাশ এবং গাইড বইয়ের অবৈধ ব্যবসা বন্ধ করা জরুরি। সরকারী পর্যায়ে তদারকি বাড়িয়ে, গাইড বইয়ের উৎপাদন ও বিতরণে জড়িত সকল সংস্থা ও ব্যক্তির উপর কঠোর শাস্তি আরোপ করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীর পরিবার হিসেবে, পাঠ্যবইয়ের দেরি হলে গাইড বইয়ের উপর নির্ভর না করে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে বিষয়বস্তু আয়ত্ত করার চেষ্টা করা উচিত। এছাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গাইড বইয়ের বিক্রয় ও বিতরণে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং বিকল্প শিক্ষাসামগ্রী প্রদান করতে উৎসাহিত করা দরকার।
আপনার কি কোনো অভিজ্ঞতা আছে যেখানে গাইড বইয়ের দাম বা প্রয়োজনীয়তা আপনার শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে? মন্তব্যে শেয়ার করুন, যাতে এই সমস্যার সমাধানে একসাথে পদক্ষেপ নেওয়া যায়।



