জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে বৃহৎ পরিসরের একটি অভিযান শুরু করেছে। শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে রফতানির বদলে খোলাবাজারে বিক্রি করার সন্দেহে শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঁচ বছরের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বন্ডের আওতায় কাঁচামাল আমদানি করে রফতানি না করে দেশীয় বাজারে বিক্রি করা হলে তা অবৈধ বলে গণ্য হবে। এজন্য শীর্ষ রফতানিকারকদের ব্যাংকিং রেকর্ড, আসিকুডা (Asycuda) সিস্টেমের আমদানি‑রফতানি ডেটা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ডেটাবেসের সঙ্গে তুলনা করা হবে।
বন্ড ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সব ধরণের ম্যানুয়াল ইউটিলিটি পারমিশন (UP) বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে কাঁচামালের প্রাপ্যতা সহ সব বন্ড সেবা কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেনদেন রেকর্ড হয় এবং কোনো অনিয়ম দ্রুত সনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এনবিআরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বন্ডের অপব্যবহার রোধে স্বয়ংক্রিয়তা এখন সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক। বন্ডেড গুদামে নিয়মিত মজুদ পরীক্ষা চালু করা হবে এবং কোনো লঙ্ঘন ধরা পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টেক্সটাইল শিল্পের উদ্যোক্তারা বন্ড অপব্যবহার ও চোরাচালানের ফলে বড় ক্ষতির মুখে পড়ার কথা জানিয়েছেন। তারা উল্লেখ করেন, প্রতি বছর প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমমানের পণ্য শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ব্যবহার করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে, যা সরকারের আয় হ্রাসের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনকারীদের প্রতিযোগিতার ক্ষমতা ক্ষয় করছে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের নজরদারি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এই ধরনের লঙ্ঘন বাড়ে। ফলে শুল্কমুক্ত কাঁচামালকে খোলাবাজারে বিক্রি করা সহজ হয়ে গেছে।
ঢাকার কর অঞ্চল‑৮ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে সাতটি প্রতিষ্ঠানের পাঁচ বছরের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এই তথ্যকে আমদানি‑রফতানি চিত্রের সঙ্গে তুলনা করে কোনো অসঙ্গতি চিহ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে শুল্কমুক্ত কাঁচামালকে খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে ধরা হবে।
কর অঞ্চল‑১৫ের পক্ষ থেকে আটটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক তথ্য তলব করা হয়েছে এবং দেশব্যাপী এই সংখ্যা শতাধিক প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমইউ) স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম উল্লেখ করেন, বন্ড অপব্যবহার দেশের রপ্তানি সক্ষমতা ও শিল্পের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
এনবিআরের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য বন্ড ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শুল্কমুক্ত কাঁচামালের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা। যদি সফল হয়, তবে সরকার প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং দেশীয় উৎপাদকদের বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে রপ্তানি শিল্পের সুনাম রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বন্ড ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণ এবং কঠোর আইনি প্রয়োগের মাধ্যমে এনবিআর ভবিষ্যতে অনুরূপ লঙ্ঘন রোধে আরও শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। শিল্পের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।



