সরকার শুক্রবার বেসামরিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার ট্যারিফ, টিকিটিং ও যাত্রীসেবার স্বচ্ছতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে। বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিমের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, ২০১৭ সালের মূল আইনের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বিধান কার্যকর করা হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশে ‘যাত্রীসেবা’ শব্দটি আইনের শিরোনাম ও প্রস্তাবনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সেবা মানের উন্নয়ন ও গ্রাহক অধিকার রক্ষায় গুরুত্বারোপ করে। ট্যারিফ ও বিভিন্ন চার্জ নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনার জন্য সরকার উচ্চপর্যায়ের উপদেষ্টা পর্ষদ গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পর্ষদ দেশি ও বিদেশি এয়ার অপারেটর, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট সেক্টরের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে ফি, চার্জ, রয়্যালটি ও ভাড়ার হার নির্ধারণে সরকারকে সুপারিশ করবে।
বহিরাগত এয়ারলাইনগুলোকে বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাতে হলে নিজস্ব কার্যালয় স্থাপন করতে হবে অথবা সম্পূর্ণ বাংলাদেশি মালিকানাধীন সংস্থাকে সাধারণ বিক্রয় প্রতিনিধি (GSএ) হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। একই সঙ্গে, কোনো এয়ার অপারেটর সরাসরি ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা বা GSএ হিসেবে কাজ করতে পারবে না, যা বাজারে অসম প্রতিযোগিতা রোধে সহায়ক হবে।
টিকিট বিক্রির ডিজিটাল চ্যানেল, যেমন অ্যাপ, ওয়েব পোর্টাল ও গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম (GDS) এখন থেকে কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন নিতে বাধ্য। ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলে কৃত্রিম সংকট বা আসন ‘ব্লকিং’ রোধে চেয়ারম্যানের কাছে রিয়েল‑টাইম এক্সেসের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের নিবন্ধন বাতিল বা স্থগিত করা যাবে।
অধ্যাদেশে বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার সাথে সঙ্গতি রেখে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং টেকসই বিমান জ্বালানি ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের বিধানও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও, এয়ারলাইন ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, যা অপারেশনাল দক্ষতা ও নিরাপত্তা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশের কার্যকর হওয়া সরকারকে বিমান ভাড়া যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে রাখতে এবং টিকিটিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। উপদেষ্টা পর্ষদের সুপারিশের মাধ্যমে ফি ও চার্জের কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে, ফলে গ্রাহকদের জন্য পরিষ্কার ও ন্যায়সঙ্গত মূল্য নির্ধারণ সম্ভব হবে।
বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর জন্য নতুন শর্তাবলী, যেমন নিজস্ব অফিস স্থাপন বা সম্পূর্ণ বাংলাদেশি সংস্থাকে GSএ হিসেবে নিয়োগ, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারগুলোকে স্থানীয় অংশীদারিত্বে জোর দিতে বাধ্য করবে। এই পদক্ষেপটি দেশের এয়ার ট্র্যাফিকের স্বায়ত্তশাসন বাড়াবে এবং বাজারে ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে।
ডিজিটাল টিকিটিং চ্যানেলের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা এবং রিয়েল‑টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা গ্রাহক সুরক্ষা ও বাজারের স্বচ্ছতা বাড়াবে। কোনো অনিয়ম বা জালিয়াতি ধরা পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, যা ভোক্তাদের আস্থা জোরদার করবে।
পরিবেশগত দিক থেকে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের জন্য টেকসই জ্বালানি ব্যবহার এবং AI‑ভিত্তিক অপারেশনাল অপ্টিমাইজেশনকে উৎসাহিত করা বিমান শিল্পকে গ্লোবাল গ্রীনহাউস গ্যাস কমানোর লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে লজিস্টিক্স ও রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ডের স্বচ্ছতা বাড়ানোও পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, এই বিধানগুলো সরকারকে বিমান শিল্পে নিয়ন্ত্রক ভূমিকা শক্তিশালী করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষায় সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে, উপদেষ্টা পর্ষদের সুপারিশের ভিত্তিতে ট্যারিফ কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে, যা বাজারের চাহিদা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
সামগ্রিকভাবে, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬, দেশের এয়ার ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করবে, ট্যারিফ ও টিকিটিং‑এ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং পরিবেশগত দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গড়ে তুলবে। এই পদক্ষেপগুলো দেশের বিমান শিল্পকে আধুনিকায়ন, প্রতিযোগিতামূলকতা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।



