গত বছরের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের বাইরের ১৯টি দেশের নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা আবেদন, গ্রিন কার্ড ও নাগরিকত্বের আবেদনসহ, স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তালিকায় আফ্রিকান দেশগুলোর উপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ডিসেম্বর ১৬ তারিখে প্রকাশিত একটি নির্দেশে মালি ও বুরকিনা ফাসোর পাশাপাশি আরও পাঁচটি দেশের নাগরিকদের ওপর সম্পূর্ণ ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। নতুন তালিকায় লাওস, নাইজার, সিয়েরা লিওন, দক্ষিণ সুদান এবং সিরিয়া অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা ভ্রমণ নথির ধারকও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষিদ্ধ হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দফতর ব্যাখ্যা দেয় যে দুর্বল নিরাপত্তা যাচাই ব্যবস্থা, তথ্য বিনিময়ের সীমাবদ্ধতা, ভিসার মেয়াদ শেষের পর অতিরিক্ত অবস্থানের সংখ্যা এবং নিজ দেশের নাগরিকদের ফেরত নিতে অনিচ্ছা এসবই নিষেধাজ্ঞার পেছনের মূল কারণ। পাশাপাশি, যেসব দেশে গুরুত্বপূর্ণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে, সেসব দেশকেও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখা হয়েছে।
এরই মধ্যে নাইজারও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় একই রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে নাইজার সামরিক সরকারের অধীনে রয়েছে এবং এই পদক্ষেপের ফলে দু’পক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
মালি, বুরকিনা ফাসো এবং নাইজার ২০২৪ সালের জুলাই মাসে নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোরদার করার লক্ষ্যে ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ নামে একটি জোট গঠন করে। এই জোটের উদ্দেশ্য সীমানা নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করা।
চাদে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রদান বন্ধের প্রথম দেশ হিসেবে ৬ জুন থেকে কার্যকর হয়। তবে, ৯ জুনের আগে যাঁদের ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল, শুধুমাত্র তাদেরই এখনো চাদে প্রবেশের অনুমতি রয়েছে। এই ব্যতিক্রমটি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিবেচনা থেকে করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে ৩৯টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই আফ্রিকান দেশ, যা দেখায় যে এই মহাদেশে ভিসা নীতির কঠোরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফ্রিকান দেশগুলোর ওপর ভিসা নীতি সীমিত ছিল; তবে মুসলিম নিষেধাজ্ঞার আওতায় সোমালিয়া, সুদান এবং লিবিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ২৬টি আফ্রিকান দেশ রয়েছে, যা প্রথম মেয়াদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
এই পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রিকান দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্কতা প্রকাশ করছেন। ভিসা নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকে সীমাবদ্ধ করবে না, বরং শিক্ষার্থী, গবেষক এবং মানবিক সাহায্যের প্রবাহেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আফ্রিকান দেশগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য বিকল্প কূটনৈতিক পথ অনুসন্ধান করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতা বজায় রাখা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।



