মাস্টোডন একটি বিকেন্দ্রীকৃত মাইক্রোব্লগিং নেটওয়ার্ক, যা ২০১৬ সালে জার্মান সফটওয়্যার ডেভেলপার ইউজেন রোচকো প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ব্যবহারকারীদের স্বতন্ত্র সার্ভার (ইনস্ট্যান্স) বেছে নিয়ে পোস্ট ও অনুসরণ করার সুযোগ দেয়, এবং একই নেটওয়ার্কের অন্য কোনো ইনস্ট্যান্সের ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা প্রদান করে। অলাভজনক সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হওয়ায়, এর লক্ষ্য শেয়ারহোল্ডার নয়, বরং ব্যবহারকারী ও সমাজের উপকারে কেন্দ্রীভূত।
ইউজেন রোচকো ২০১৬ সালে Mastodon গঠন করেন, যখন টুইটার ও ফেসবুকের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলো ইতিমধ্যে বাজারে আধিপত্য বিস্তার করছিল। রোচকোর লক্ষ্য ছিল একটি ওপেন‑সোর্স, স্বয়ংসম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক তৈরি করা, যেখানে কোনো একক সংস্থা পুরো সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ না করে। তাই Mastodon একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত, যা তার নীতি ও উন্নয়নকে ব্যবহারকারীর স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে চায়।
Mastodon-কে প্রচলিত সামাজিক মিডিয়া থেকে আলাদা করে তার বিকেন্দ্রীকরণ মডেল। এটি ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার না করে, ইমেইলের মতো ফেডারেটেড নেটওয়ার্কের নীতি অনুসরণ করে। প্রতিটি ইনস্ট্যান্স স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হয়, তবে একই প্রোটোকল শেয়ার করে, ফলে ব্যবহারকারীরা একে অপরের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারে। এই কাঠামো ব্যবহারকারীর ডেটা কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা না হওয়ায় গোপনীয়তা ও স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ বাড়ায়।
সেবায় নিবন্ধন করার সময় ব্যবহারকারীকে প্রথমে একটি ইনস্ট্যান্স নির্বাচন করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ “climatejustice.social” নামের ইনস্ট্যান্সে সাইন‑আপ করেন, তবে তার ঠিকানা হবে username@climatejustice.social। এই ঠিকানা ইমেইলের মতোই কাজ করে; ব্যবহারকারী একই ঠিকানার মাধ্যমে পোস্ট, অনুসরণ এবং মন্তব্য করতে পারে। ইনস্ট্যান্সের নির্বাচন ব্যবহারকারীর আগ্রহ, নিয়মাবলী এবং কমিউনিটি সংস্কৃতির উপর নির্ভরশীল।
একবার ইনস্ট্যান্সে নিবন্ধন সম্পন্ন হলে, ব্যবহারকারী অন্য কোনো ইনস্ট্যান্সের ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, ঠিক ইমেইল ব্যবহারকারীর মতোই। তবে কিছু ইনস্ট্যান্স নির্দিষ্ট অন্য ইনস্ট্যান্সকে ব্লক করতে পারে, যদি তারা তাদের নীতি বা বিষয়বস্তুকে অনুপযুক্ত মনে করে। এই ব্লকিং ব্যবস্থা প্রতিটি কমিউনিটির স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করে, একই সঙ্গে নেটওয়ার্কের সামগ্রিক সংযোগ বজায় রাখে।
ইনস্ট্যান্সগুলো বিভিন্ন ব্যক্তি, দল বা সংস্থা পরিচালনা করে, এবং প্রত্যেকের নিজস্ব নিয়মাবলী থাকে। কিছু ইনস্ট্যান্স নির্দিষ্ট থিমের উপর কেন্দ্রীভূত, যেমন পরিবেশ, প্রযুক্তি বা শিল্প, আর অন্যগুলো সাধারণ পাবলিক ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত। মডারেশন নীতি, সাইন‑আপ শর্ত এবং কন্টেন্ট গাইডলাইন ইনস্ট্যান্স অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে, যা ব্যবহারকারীর জন্য তার মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কমিউনিটি বেছে নেওয়া সহজ করে।
ইলন মাস্ক টুইটার অধিগ্রহণ করে নাম পরিবর্তন করে X করে দেওয়ার পর, বহু ব্যবহারকারী টুইটারের ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বিকল্প প্ল্যাটফর্ম খুঁজতে শুরু করেন। সেই সময়ে Mastodon-এ ব্যবহারকারী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়, পাশাপাশি ব্লুস্কাই এবং ইনস্টাগ্রামের থ্রেডসের মতো নতুন সেবারও পরীক্ষা করা হয়। তবে Mastodon-কে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠার ফলে ইতিমধ্যে তার নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল, যা তাকে শুধুমাত্র টুইটারের বিকল্প নয়, একটি স্বতন্ত্র সামাজিক নেটওয়ার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে।
বছরের পর বছর Mastodon তার প্রযুক্তিগত ভিত্তি ও কমিউনিটি সংস্কৃতি উন্নত করে, ফলে ব্যবহারকারীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে দীর্ঘমেয়াদী সংযোগ গড়ে তুলতে পারে। ফেডারেটেড কাঠামো নতুন ইনস্ট্যান্সের দ্রুত সৃষ্টি ও বৈচিত্র্যকে সমর্থন করে, যা বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও বিষয়ের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। এই বৈশিষ্ট্য Mastodon-কে একক প্ল্যাটফর্মের তুলনায় অধিক নমনীয় ও অভিযোজ্য করে তুলেছে।
অলাভজনক মডেল এবং বিকেন্দ্রীকৃত নকশা Mastodon-কে শেয়ারহোল্ডার-চালিত সামাজিক মিডিয়ার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করে। ব্যবহারকারীর ডেটা কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ না হওয়ায় গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমে, এবং কমিউনিটি-নির্ধারিত নীতি অনুযায়ী কন্টেন্ট পরিচালনা করা যায়। এই দিকগুলো ভবিষ্যতে সামাজিক মিডিয়ার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে নতুন দৃষ্টিকোণ আনতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে Mastodon-কে একটি বিকল্প নয়, বরং একটি সমন্বিত ডিজিটাল পাবলিক স্কোয়ারের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে ব্যবহারকারী নিজের নেটওয়ার্ক গঠন ও পরিচালনা করতে সক্ষম। ডেটা স্বায়ত্তশাসন, কমিউনিটি ভিত্তিক মডারেশন এবং ওপেন‑সোর্স প্রযুক্তি একত্রে সামাজিক যোগাযোগের নতুন মডেল গড়ে তুলতে পারে। তাই Mastodon-কে প্রযুক্তি ও সমাজের সংযোগস্থলে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত।



