বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নাগরিকদের অধিকার ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি সিএসআইডি (Centre for Services and Information on Disability) পরিচালিত এবং দেশের প্রতিবন্ধী জনসংখ্যার স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবস্থার বিশদ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে।
সিএসআইডি দ্বারা সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রতিবন্ধী নারীর ও কিশোরীর ৪০.৯৫ শতাংশ জন্মগত কারণেই প্রতিবন্ধী হয়। আর ৩৩.২ শতাংশের ক্ষেত্রে চিকিৎসা সংক্রান্ত ভুল বা অপর্যাপ্ত সেবার ফলস্বরূপ প্রতিবন্ধিতা দেখা দেয়। বাকি ৫৫.৭৪ শতাংশ রোগ, জ্বর, দুর্ঘটনা ইত্যাদি বহিরাগত কারণের সঙ্গে যুক্ত।
স্বাধীনতার ৪১ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দশ ভাগ প্রতিবন্ধী মানুষকে লক্ষ্য করে কোনো ব্যাপক ও বাস্তবভিত্তিক নীতি কার্যকর করা যায়নি। ফলে এই গোষ্ঠীটি প্রায়শই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে এবং তাদের মৌলিক অধিকার অর্জনে বাধার সম্মুখীন হয়।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, বিবাহ ও প্রজনন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধীরা প্রায়শই বৈষম্যের শিকার হয়। পরিবারিক ও সামাজিক মানমর্যাদার ভয়ে তাদেরকে প্রায়শই আলাদা করে রাখা হয়, ফলে তারা সমাজের সাধারণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় না।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান সুযোগ, সমান অংশগ্রহণ ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এই নীতিগত ভিত্তি সত্ত্বেও, বাস্তবায়নে যথেষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়নি।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের জন্য আমানত গ্রহণ, ঋণ প্রদান এবং ব্যাংকিং সেবা সহজতর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জাতীয় বাজেটে প্রতিবন্ধী কল্যাণের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, তবে এই আর্থিক সহায়তা সত্ত্বেও বাস্তব পরিবর্তন সীমিত রয়ে গেছে।
প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করার সম্ভাবনা রয়েছে। স্টিফেন হকিং, হেলেন কেলারসহ বিশ্বব্যাপী বহু সফল ব্যক্তির উদাহরণ দেখায় যে, সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা এবং কর্মক্ষেত্রে সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা। বিশেষ করে, শারীরিক ও জ্ঞানীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিশেষায়িত সরঞ্জাম ও সফটওয়্যার ব্যবহার করে তাদের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করা যেতে পারে।
১৯৯২ সাল থেকে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে প্রতি বছর ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিব পালন করা হয়। এই দিনটি প্রতিবন্ধী অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতি নির্ধারকদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতিবন্ধী নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কীভাবে আমরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি বাস্তবায়ন করতে পারি, তা নিয়ে আলোচনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।



