২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীলতার সূচক দেখালেও কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট রয়ে গিয়েছিল। বহিরাগত চাপ হ্রাস পেয়েও মুদ্রাস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের কমতি এবং আর্থিক খাতের চাপ অব্যাহত ছিল। নীতি সংস্কার, বাণিজ্যিক ধাক্কা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোকে একত্রে বিবেচনা করলে বছরের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার অসমান রইল।
ব্যালেন্স‑অফ‑পেমেন্টের ঘাটতি সংকুচিত হওয়ায় মুদ্রা রিজার্ভ বাড়ে এবং মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়। বিদেশি শ্রমিকের রেমিট্যান্স ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী থাকলেও রপ্তানি হ্রাস পায়, আর আমদানি বাড়ে। এই প্রবণতা বাণিজ্যিক ঘাটতি হ্রাসে সহায়তা করলেও রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের আয় কমে যায়।
মুদ্রাস্ফীতি তিন বছর পর জুনে ৯% এর নিচে নেমে আসে, তবে ৮%‑এর উপরে স্থায়ী থাকে। ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ফলে নিম্ন ও স্থির আয়ের গোষ্ঠীকে খাবার কমাতে বাধ্য করা হয়। দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যকে প্রভাবিত করে এই অবস্থা, বিশেষ করে গ্রামীণ ও নগর দরিদ্র পরিবারের জন্য।
বেসরকারি বিনিয়োগের গতি ধীর থাকে; অক্টোবর ২০২৫-এ বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি ঐতিহাসিক নিম্ন ৬.২৩% এ নেমে আসে। অন্যদিকে, পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশি মূলধন প্রবাহ বাড়ে, যা মোট বিদেশি বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
অর্থনৈতিক খাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক সূচক হল নন‑পারফরমিং লোনের (এনপিএল) তীব্র বৃদ্ধি। মোট ঋণের ৩৬% অংশ, অর্থাৎ প্রায় টাকায় ৬.৪৪ লাখ কোটি, অনাদায়ী হয়ে দাঁড়ায়—২০০০ সাল থেকে সর্বোচ্চ স্তর। একাধিক ব্যাংকের ডিফল্ট অনুপাত ৫০%‑এর উপরে পৌঁছায়, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২৫ সালে সর্বনিম্ন উন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন। তবে ব্যবসায়িক গোষ্ঠী পছন্দের হার হারানোর ঝুঁকি উল্লেখ করে উত্তীর্ণের সময়সীমা বিলম্বের দাবি রাখে।
সরকার পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ইসলামী ব্যাংককে একত্রিত করে রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তরিত করে, যার জন্য ২০,০০০ কোটি টাকার মূলধন সাপোর্ট প্রদান করে। একই সঙ্গে নয়টি নন‑ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনকে তরলীকরণ করা হয়, যা আর্থিক খাতের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭% রিসিপ্রোক্যাল শুল্কের প্রয়োগের পর, পরে তা ২০% এ কমলেও গার্মেন্টসসহ বেশ কিছু পণ্যের রপ্তানিতে প্রভাব পড়ে। এই শুল্ক নীতি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয় এবং রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের মুনাফা হ্রাস করে।
অর্থনৈতিক নীতি ও প্রশাসনের বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে সরকার একটি আদেশ জারি করে, যার মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বিলুপ্ত করার পরিকল্পনা করা হয়। এই পদক্ষেপটি দেশের কর ব্যবস্থায় অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারে এবং বিভিন্ন স্বার্থের সংঘাতের সূত্রপাত করে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি কিছু ইতিবাচক সূচক দেখালেও কাঠামোগত দুর্বলতা, আর্থিক খাতের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্দীপনা এবং এনপিএল হ্রাসের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নীতি প্রয়োজন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই বৃদ্ধি নিশ্চিত করা যায়।



