ফ্রান্স সরকার আগামী জানুয়ারি থেকে ১৫ বছরের নিচের কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং হাইস্কুলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বিবেচনা করছে। এই প্রস্তাবটি ফরাসি কাউন্সিল অব স্টেটের সামনে ৮ জানুয়ারি আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হবে।
প্রস্তাবিত বিলের মূল উদ্দেশ্য হল তরুণদের অনলাইন পরিবেশে অতিরিক্ত সময় কাটানো এবং মোবাইল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে সৃষ্ট মানসিক ও শৈক্ষিক সমস্যাগুলি কমিয়ে আনা। এতে ১৫ বছরের নিচের সকল শিক্ষার্থীকে সামাজিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার থেকে বাদ দেওয়া এবং নতুন শিক্ষাবর্ষে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে, হাইস্কুলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই বিলটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান ডেটা সুরক্ষা ও শিশু সুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়মাবলীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। পূর্বে একই ধরনের একটি উদ্যোগ ইউরোপীয় আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় কার্যকর করা যায়নি, তাই নতুন প্রস্তাবটি সেই ত্রুটিগুলি দূর করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
বর্তমানে ২০১৮ সালের একটি আইন অনুযায়ী, নার্সারি স্কুল থেকে মিডল স্কুল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ায় এই বিধানটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। নতুন প্রস্তাবটি এই অভিজ্ঞতা থেকে শিখে, উচ্চশিক্ষা স্তরে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য রাখছে।
সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক নেটওয়ার্কের অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মমর্যাদার হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে বলে রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে, মোবাইল ফোনের ক্রমাগত নোটিফিকেশন ও স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানো মনোযোগের ক্ষমতা হ্রাস এবং শিক্ষাগত পারফরম্যান্সে ক্ষতি করে।
ফ্রান্সের এই পদক্ষেপের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া ইতিমধ্যে ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার নিষিদ্ধের নীতি গ্রহণ করেছে। অস্ট্রেলিয়ায় এই বিধান গত ১০ ডিসেম্বর কার্যকর হয়েছে, আর মালয়েশিয়ায় আগামী বছর থেকে একই ধরনের নিয়ম প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই ধরনের নীতি গ্রহণের প্রবণতা ফ্রান্সকে প্রেরণা জোগাচ্ছে।
বিলটি পর্যালোচনার সময় পার্লামেন্টের সদস্যরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মতামত প্রকাশ করবেন। কিছু প্রতিনিধি যুক্তি দেন যে, সামাজিক মাধ্যমের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা তরুণদের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে সীমাবদ্ধ করতে পারে। অন্যদিকে, শিক্ষাবিদ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, বর্তমান গবেষণার ফলাফল দেখায় এই ধরনের সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ বিকাশে সহায়ক হতে পারে।
প্রস্তাবিত আইনের বাস্তবায়ন কিভাবে হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে সরকার ইতিমধ্যে স্কুলগুলোকে প্রযুক্তি ব্যবহার সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা তৈরি করার জন্য প্রস্তুত করছে। এই নির্দেশিকায় শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিলটি যদি পার্লামেন্টে অনুমোদিত হয়, তবে ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসবে। হাইস্কুলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার বন্ধ হলে, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে মনোযোগ বাড়বে এবং শিক্ষকেরা পাঠদান সহজে পরিচালনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে, সামাজিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার সীমিত হলে, কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন হিংসা, সাইবারবুলিং এবং মিথ্যা তথ্যের সংস্পর্শ কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই নীতির সমালোচকরা ইন্টারনেটের স্বাধীনতা ও তথ্যের প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন তুলছেন। তারা দাবি করছেন যে, সরকারকে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে।
ফরাসি কাউন্সিল অব স্টেটের পর্যালোচনা শেষ হওয়ার পর, বিলটি প্যার্লামেন্টের উভয় শাখায় ভোটের মুখোমুখি হবে। ভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে, ২০২৬ সালের নতুন শিক্ষাবর্ষে হাইস্কুলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হতে পারে এবং ১৫ বছরের নিচের কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ হতে পারে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ফ্রান্সের যুব নীতি ও ডিজিটাল অধিকার নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন দিক উন্মোচিত হবে।



