রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ৩১ ডিসেম্বর টেলিভিশনে সম্প্রচারিত নববর্ষের বার্তায় দেশের ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে “বীরদের” সমর্থন করার আহ্বান জানিয়ে, যুদ্ধের বিজয়কে নিশ্চিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
পুতিনের ভাষণে তিনি রাশিয়ার সৈন্যদের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে, “আপনাদের ওপর এবং আমাদের বিজয়ের ওপর আমাদের বিশ্বাস” বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের নাগরিকদেরকে সামরিক কর্মীদের সমর্থন করতে অনুরোধ করেন, যাতে যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐক্য বজায় থাকে।
যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা এখনও অনিশ্চিত, কারণ ইউক্রেনের সঙ্গে তীব্র সামরিক সংঘর্ষ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি আলোচনার প্রচেষ্টা চলমান। পুতিনের এই মন্তব্যের পরেও যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয়নি, এবং যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষের আক্রমণ ও প্রতিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
পুতিনের এই নববর্ষের ভাষণ ২৬ বছর আগে বোরিস ইলচিনের অপ্রত্যাশিত পদত্যাগের পর রাশিয়ার শীর্ষে ওঠার ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে তুলনা করা হয়। ইলচিনের শেষ নববর্ষের বার্তায় তিনি হঠাৎ করে ক্ষমতা ত্যাগের ঘোষণা দেন, যা দেশের নেতৃত্বকে পুতিনের হাতে হস্তান্তর করে।
ইলচিনের পর থেকে রাশিয়া দীর্ঘ সময় ধরে পুতিনের নেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি পূর্বের গোয়েন্দা কর্মকর্তা থেকে রাজনৈতিক নেতা হয়ে, দেশের নীতি ও কাঠামোকে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী গড়ে তোলেন। তার শাসনামলে সোভিয়েত যুগের নেতা জোসেফ স্টালিনের প্রতি ইতিবাচক উল্লেখ এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের পরের “লজ্জা” দূর করার প্রচেষ্টা দেখা যায়।
পুতিনের শাসনামলে রাশিয়া চেচনিয়া, জর্জিয়া এবং সিরিয়ার মতো অঞ্চলে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। চেচনিয়ায় কঠোর দমন, জর্জিয়ায় সামরিক আক্রমণ এবং সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনকে সমর্থন করার মাধ্যমে রাশিয়া তার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চেয়েছে। এইসব কার্যক্রমে নাগরিকদের ওপর বোমা হামলা ও মানবিক ক্ষতি ঘটেছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রম যদি সীমান্তের কাছে পৌঁছে যায়, তবে তা ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে বলে সতর্কতা জারি হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে নোভগোরোদের একটি রাশিয়ান রেসিডেন্সের নিকটে ড্রোনের ধ্বংসের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় দাবি করে, এটি ইউক্রেনের আক্রমণের অংশ ছিল এবং ড্রোনটি সফলভাবে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
কিয়েভের পক্ষ থেকে এই ঘটনার কোনো স্বীকৃতি না দিয়ে, ইউক্রেনের সরকার দাবি করে যে রাশিয়া নিজে এই ঘটনার মিথ্যা উপস্থাপন করে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের জন্য “ফলস ফ্ল্যাগ” অপারেশন চালাচ্ছে। তারা রাশিয়ার এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাশিয়া এই ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান শান্তি আলোচনায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। পুতিনের সরকার বলেছে, যদি ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এমন আক্রমণ চালু থাকে, তবে তারা আলোচনার শর্তে আরও কঠোর রূপরেখা অনুসরণ করবে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, পুতিনের এই নববর্ষের বার্তা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোরদার করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার অবস্থানকে দৃঢ় করার উদ্দেশ্য বহন করে। যুদ্ধের ফলাফল এখনও অনিশ্চিত থাকায়, পরবর্তী সময়ে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি এবং সামরিক পরিস্থিতির পরিবর্তন রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে, পুতিনের নববর্ষের ভাষণ রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের প্রতি দৃঢ়তা এবং ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত বহন করে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় স্তরে রাজনৈতিক গতিবিধিকে প্রভাবিত করবে।



