২০২৫ সালের ১৩ জুন ভোর ৩টা ১৫ মিনিটে ইরানের রাজধানী তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটায়, যা ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের বিশাল আক্রমণের ফল। ২০০টিরও বেশি বিমান ১০০টিরও বেশি পারমাণবিক, সামরিক ও আবাসিক স্থাপনা লক্ষ্য করে, ফলে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও সামরিক কমান্ডারসহ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। এই আক্রমণের পর দুই দেশের মধ্যে ১২ দিনের তীব্র সংঘাত শুরু হয়, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
ইসরায়েলি সরকার এই অভিযানকে “অপারেশন রাইজিং লায়ন” নামে ঘোষণা করে, যার লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ও সামরিক নেতৃত্বকে দুর্বল করা। আক্রমণের পরপরই ইরানও প্রতিক্রিয়ায় বৃহত্তম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, প্রতিদিন শত শত মিসাইল উৎক্ষেপণ করে, যার মধ্যে ৫০০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক রকেট অন্তর্ভুক্ত। এই পারস্পরিক ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ই সংঘাতের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়।
ইরানের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইসরায়েলি আক্রমণে পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তাসহ ৬১০ জন মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ৪৯ জন নারী এবং ১৩ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত। সবচেয়ে ছোট শিশুর বয়স মাত্র দুই মাস। পাশাপাশি ৪৭৪৬ জন আহত হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৫ জন নারী। আহতদের মধ্যে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্তদের জন্য জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আহত ও মৃতের সংখ্যা ছাড়াও অবকাঠামোগত ক্ষতি ব্যাপক। সাতটি হাসপাতাল, নয়টি অ্যাম্বুলেন্স, চারটি স্বাস্থ্য ইউনিট এবং ছয়টি জরুরি শিবির ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ধ্বংসাবশেষের ফলে তেহরানের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে, এবং পুনর্গঠন কাজের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
সংঘাতের পটভূমিতে গাজা অঞ্চলে ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছিল। উভয় পক্ষই “অপারেশন ট্রু প্রমিজ” সিরিজের অংশ হিসেবে একে অপরের ওপর আক্রমণ চালায়, এবং ইরান তার শেষ পাল্টা হামলাকে “ট্রু প্রমিজ ৩” বলে উল্লেখ করেছে। এই ধারাবাহিকতা দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলেছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস রেডফোর্ড মন্তব্য করেন, “ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে এই ধরনের পারমাণবিক হুমকি গ্লোবাল নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।” একই সঙ্গে, ইউএন সিকিউরিটি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান গুটেরেস বলেন, “এ ধরনের পারমাণবিক হুমকি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।” এই মন্তব্যগুলো সংঘাতের আন্তর্জাতিক প্রভাবকে তুলে ধরে।
ইউরোপে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এশিয়ায় ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা চলমান থাকায়, ইসরায়েল-ইরান সংঘাত বিশ্ব নিরাপত্তা কাঠামোর উপর একাধিক ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন যে, একাধিক সামরিক সংঘাতের সমন্বয় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলবে এবং সমাধান খুঁজে পেতে সময় বাড়িয়ে দেবে।
ইরানের সরকার এই ১২ দিনের যুদ্ধের পর শান্তি আলোচনা শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তবে ইসরায়েলি পক্ষের শর্তাবলী এখনও স্পষ্ট নয়। উভয় দেশের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় পরবর্তী আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা চায়।
ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, আক্রমণের সময় ব্যবহৃত উচ্চ-প্রযুক্তি ড্রোন ও সুনির্দিষ্ট গাইডেড মিসাইলের মাধ্যমে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক সুবিধা লক্ষ্য করা হয়েছিল, যা ভবিষ্যতে পারমাণবিক বিস্তার রোধে একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে ইরানের প্রতিক্রিয়া দেখায় যে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরিমাণ ও গতি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে।
এই সংঘাতের পর, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা গুলো তেহরানে জরুরি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তেহরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালগুলোর বিকল্প ব্যবস্থা চালু করেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার কাজের জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।
সংঘাতের সমাপ্তি সত্ত্বেও, পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, ভবিষ্যতে এমন ধরনের পারস্পরিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিনিময় পুনরায় ঘটলে, তা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তাই, কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে সক্রিয় করে ত্বরিত সমঝোতা গড়ে তোলা জরুরি।
ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের ১২ দিন শেষ হওয়া সত্ত্বেও, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখনই সময়, যাতে উভয় পক্ষের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সমন্বিত করে স্থায়ী শান্তি চুক্তি গড়ে তোলা যায় এবং পারমাণবিক হুমকির পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।



