১৯১২ সালের ১৫ই এপ্রিল রাতের দিকে আটলান্টিকের গাঢ় জলে টাইটানিকের ডুবে যাওয়া ইতিহাসের অন্যতম দুঃখজনক ঘটনা হিসেবে স্মরণীয়। যদি সেই রাতে আপনি ঐ জাহাজে থাকতেন, কীভাবে নিজের জীবন রক্ষা করতে পারতেন—এটি নিয়ে সম্প্রতি চলচ্চিত্র নির্মাতা জেমস ক্যামেরনের কিছু চিন্তা প্রকাশ পেয়েছে।
টাইটানিকের গল্পকে ভিত্তি করে তৈরি চলচ্চিত্রটি এখন পর্যন্ত সর্বাধিক দেখা দুর্যোগ‑বেঁচে থাকা থ্রিলার হিসেবে গন্য। ক্যামেরনের পরিচালনায় তৈরি ছবিটি ১৯৯৭ সালে মুক্তি পেয়ে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি দর্শকের মন জয় করেছে এবং টাইটানিককে জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি আইকন করে তুলেছে।
ক্যামেরন উল্লেখ করেছেন যে, যদি আপনি টাইটানিকের ডুবে যাওয়ার সময় বেঁচে থাকতে চান, তবে একা ভ্রমণ করা সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পছন্দ হতে পারে। পরিবারের সঙ্গে থাকলে স্বজনের নিরাপত্তা প্রথমে ভাবতে হয়, ফলে নিজের জন্য যথেষ্ট জায়গা বা সুযোগ পাওয়া কঠিন হতে পারে। এছাড়া তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর যাত্রী হওয়াকে সুবিধাজনক বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ প্রথম শ্রেণীর যাত্রীরা তুলনামূলকভাবে বেশি লাইফবোটে চড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, আর তৃতীয় শ্রেণীর বেশিরভাগই ডেকের নিচে আটকে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিলেন।
ঐ সময়ের নৌকা চালকের ভুল ব্যাখ্যা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দ্বিতীয় অফিসার চার্লস লাইটলর ‘মহিলা ও শিশু প্রথম’ আদেশকে শুধুমাত্র মহিলাই ও শিশুরাই চড়বে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, ফলে কিছু লাইফবোট সম্পূর্ণভাবে ভরা না হয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই ত্রুটি প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য কিছুটা সুবিধা এনে দেয়, তবে তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীরা অধিকাংশই ডেকের নিচে আটকে রইল।
ক্যামেরন এই ঘটনাকে নিয়ে বিভিন্ন “যদি‑হয়তো” পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করেন। তিনি বলেন, বর্তমান জ্ঞান ও ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে অনুমতি পেলে কীভাবে পুরো জাহাজের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত, তা নিয়ে তিনি এবং তার টাইটানিক বিশেষজ্ঞ দল ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করেন। আরেকটি কল্পনাপ্রসূত দৃশ্য হল, সময় ভ্রমণকারী কোনো ব্যক্তি অতীতের টাইটানিকের ডুবে যাওয়া দেখার জন্য ফিরে এসে, সময়যন্ত্র ব্যর্থ হলে নিজেই বেঁচে থাকার পথ খুঁজতে হবে।
যদি সাধারণভাবে লাইফবোটে চড়ার সুযোগ না পান, ক্যামেরনের মতে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হল জাহাজের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে প্রারম্ভিক পর্যায়ে চালু হওয়া লাইফবোটের দিকে নজর রাখা। লাইফবোট যখন পানিতে ছাড়বে, তখন দ্রুত জাহাজ থেকে লাফিয়ে সেই বোটের দিকে সাঁতার কাটা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে।
টাইটানিকের পানির তাপমাত্রা প্রায় ২৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় -২ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছিল, যা শীতল হলেও স্বল্প সময়ের জন্য সাঁতার কাটলে শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়। ক্যামেরন উল্লেখ করেন, যদি বোটটি খুব দূরে না থাকে, তবে সাঁতারের সময় প্রায় এক-দুই মিনিটের মধ্যে বোটের পৃষ্ঠে পৌঁছানো সম্ভব।
লাইফবোটের যাত্রীরা, বিশেষত যখন বোটের ক্ষমতা পূর্ণ না হয়, তখন অতিরিক্ত মানুষকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক থাকে। তাই জাহাজের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে সাঁতার কাটা ব্যক্তিকে বোটের ক্রু ও যাত্রীরা সম্ভবত তাড়া দিয়ে বোটে উঠিয়ে নেবে। এই পদ্ধতি যদিও ঝুঁকিপূর্ণ, তবু তা ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ক্যামেরনের বিশ্লেষণ দেখায় যে একা ভ্রমণ, দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট এবং জাহাজের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে লাইফবোটের প্রথম রাউন্ডে সাঁতার কাটা—এই তিনটি কৌশল মিলিয়ে টাইটানিকের ডুবে যাওয়ার রাতে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ করা যায়। যদিও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সবকিছুই অনুমানভিত্তিক, তবে এই ধারণাগুলো ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বাস্তবসম্মত বেঁচে থাকার পরিকল্পনা উপস্থাপন করে।



