মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত দেশের মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিবেশের বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো উল্লেখযোগ্য হ্রাস পায়নি এবং মোট ৫৯৯টি ঘটনার ফলে ৫,৬০৪ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনার মধ্যে ৮৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে, যার মধ্যে ৬৫ জন বিএনপি, ৮ জন আওয়ামী লীগ, ৩ জন জামায়াতে ইসলামী এবং ১০ জন অচিহ্নিত নাগরিক অন্তর্ভুক্ত।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতার শিকার প্রায় চার হাজার নারী ও শিশুও রয়েছে। গুলিবিদ্ধের সংখ্যা ৯৭, যা পুরো বছরের গুলিবিদ্ধের মোটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। নির্বাচনের ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র ও প্রচারাভিযানকে কেন্দ্র করে ২৬টি ঘটনার ফলে ২৫২ জন আহত হয়েছে, যার মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের ওপর সরাসরি হামলার সংখ্যা ১৬৯টি রেকর্ড করা হয়েছে। এই ঘটনার ফলে ২৩৪ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছে, যার মধ্যে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের হামলা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
২০২৪ সালে সরকার পতন ও জুলাই-আগস্টের গণভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ৬৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭,৭৮০ জনকে নির্দিষ্টভাবে আসামি করা হয়েছে, আর ১১,১৭৯ জনকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে ২৯টি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ৩,৬৯৫ জন নেতা-কর্মীকে সারাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময়ে, ফেব্রুয়ারিতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে চালু ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ এর আওতায় ২২,২৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১১,৩১৩ জন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট।
পুলিশের বিশেষ অভিযানে মোট ২,১২,৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও আদালতে মামলার নিষ্পত্তির গতি কিছুটা বাড়েছে, তবু উচ্চ পরিমাণের অপরাধমূলক মামলার ব্যাকলগ এবং দীর্ঘমেয়াদী আটক ব্যবস্থা মানবাধিকার সংস্থার দৃষ্টিতে উদ্বেগের কারণ।
এমএসএফের বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও ব্যাপক গ্রেপ্তার মানবাধিকার রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ করে। তারা দাবি করছেন, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত বিচার প্রক্রিয়া ছাড়া পরিস্থিতি উন্নত করা কঠিন। ভবিষ্যতে নির্বাচনী সময়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, গ্রেপ্তার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু করা জরুরি বলে তারা পরামর্শ দিচ্ছেন।
এই প্রতিবেদনটি স্থানীয় মানবাধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলোর তথ্য যাচাইয়ের পর প্রকাশিত হয়েছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, মানবাধিকার উন্নয়নের জন্য সরকারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং রাজনৈতিক বিরোধের সমাধানে আইনি প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালে মানবাধিকার ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক সংকেত দিচ্ছেন। রাজনৈতিক সহিংসতা, গ্রেপ্তার এবং মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নাগরিক স্বাধীনতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।



