ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বুধবার সকাল ১০:৩০ টায় ওড়িশা উপকূল থেকে দুটি প্রলয় মিসাইল উৎক্ষেপণ করেছে। এই উৎক্ষেপণ বঙোপসাগরের জলে একটি রুটিন পরীক্ষা হিসেবে পরিচালিত হয়, যা দেশের স্বল্প‑পরিসরের ব্যালিস্টিক ক্ষমতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে করা হয়।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে এই শুটিং কোনো জরুরি সামরিক অভিযান নয়, বরং ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন) এর পরিকল্পিত পরীক্ষার অংশ। পরীক্ষার সময় মিসাইলগুলো নির্ধারিত কোর্সে অগ্রসর হয়ে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছেছে। এই তথ্য চাঁদিপুরের ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রেঞ্জের স্থল সেন্সর এবং সমুদ্রের পর্যবেক্ষণ জাহাজ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রলয় মিসাইলের আগে মাত্র এক সপ্তাহ আগে, ২৩ ডিসেম্বর, পিনাকা নামের আরেকটি মিসাইলের সফল পরীক্ষা করা হয়েছিল। দুইটি স্বল্প‑পরিসরের ব্যালিস্টিক মিসাইলের ধারাবাহিক সফলতা ডিআরডিওকে আত্মবিশ্বাসী করেছে যে তাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া সঠিক পথে রয়েছে। এই ধারাবাহিকতা দেশের স্বল্প‑দূরত্বের কৌশলগত শুটিং ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ডিআরডিও কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রলয় মিসাইল উচ্চ নির্ভুলতা সহ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং বিভিন্ন ধরণের যুদ্ধবস্তু বহন করতে পারে। মিসাইলের গঠন মডুলার, ফলে প্রয়োজন অনুসারে হেডের পরিবর্তন সহজে করা যায়। এছাড়া, এটি কঠিন ভূ-প্রকৃতির ওপরেও সঠিক গাইডেন্স বজায় রাখতে সক্ষম, যা তীব্র যুদ্ধক্ষেত্রে বড় সুবিধা দেয়।
প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, প্রলয় মিসাইলের রেঞ্জ প্রায় ১৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই পরিসরটি সমুদ্রের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে শুরু করে দেশের অভ্যন্তরে গভীর এলাকায় লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষমতা প্রদান করে। রেঞ্জের এই বৈচিত্র্য মিসাইলকে কৌশলগতভাবে বহুমুখী ব্যবহারিকতা দেয়, বিশেষ করে সীমান্ত রক্ষা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া মিশনে।
মিসাইলের ইন্ধন ব্যবস্থা কঠিন জ্বালানী (সলিড ফুয়েল) ভিত্তিক, যা দ্রুত লঞ্চ এবং কম রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করে। এছাড়া, ডিআরডিও মিসাইলের গাইডেন্স সিস্টেমে আধুনিক ইনারশিয়াল ন্যাভিগেশন এবং রাডার-সহায়িত ট্র্যাকিং প্রযুক্তি সংযুক্ত করেছে। এই প্রযুক্তিগুলো মিসাইলকে নির্ধারিত পথে অটল রাখে এবং লক্ষ্যবস্তুতে সুনির্দিষ্ট হিট নিশ্চিত করে।
প্রলয় মিসাইলের সমুদ্রভিত্তিক লঞ্চিং ক্ষমতা ভারতের পূর্ব উপকূলের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করে। সমুদ্র থেকে লঞ্চের মাধ্যমে শত্রু বাহিনীর কাছে অপ্রত্যাশিত দিক থেকে হুমকি তৈরি করা সম্ভব, যা সামরিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এই বৈশিষ্ট্যটি বিশেষ করে বঙোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে গৃহীত হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক এবং থিঙ্ক ট্যাঙ্কের বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, স্বল্প‑পরিসরের ব্যালিস্টিক মিসাইলের উপস্থিতি আর্টিলারি রকেট ও দীর্ঘ‑পরিসরের মিসাইলের মধ্যে একটি ফাঁক পূরণ করে। প্রলয়ের দ্রুত প্রতিক্রিয়া সময় এবং উচ্চ নির্ভুলতা তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবেলায় কার্যকর। ফলে, ভূমি বাহিনীর কৌশলগত পরিকল্পনা ও অপারেশনাল প্রস্তুতিতে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়।
ডিআরডিওর অডভান্সড সিস্টেমস ল্যাবরেটরি এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর মিসাইল উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়ে প্রলয় প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। এই সহযোগিতা মিসাইলের ডিজাইন, উৎপাদন এবং ফিল্ড টেস্টিং প্রক্রিয়াকে সমন্বিত করে, ফলে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়। এছাড়া, ডিআরডিও মিসাইলকে বিদ্যমান কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশে, বঙোপসাগরের ওপর বাড়তে থাকা বাণিজ্যিক নৌচালনা এবং কৌশলগত স্বার্থের কারণে ভারত এই ধরনের স্বল্প‑পরিসরের ব্যালিস্টিক ক্ষমতা প্রদর্শনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। প্রলয় মিসাইলের সফল পরীক্ষা দেশীয় স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর একটি স্পষ্ট সংকেত। এটি বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বদেশীয় রক্ষা ক্ষমতা শক্তিশালী করে।
ভবিষ্যতে প্রলয় মিসাইলকে স্থল‑ভিত্তিক লঞ্চার বা নৌবাহিনীর জাহাজে সংযুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন বহুমুখী ব্যবহার মিসাইলের অপারেশনাল রেঞ্জ এবং কৌশলগত প্রয়োগকে আরও বিস্তৃত করবে। ডিআরডিও ইতিমধ্যে পরবর্তী পর্যায়ের পরীক্ষার পরিকল্পনা করেছে, যেখানে গাইডেন্স অ্যালগরিদমের সূক্ষ্মতা বাড়ানো এবং নেটওয়ার্ক‑সেন্ট্রিক যুদ্ধের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন পরীক্ষা করা হবে।
সারসংক্ষেপে, প্রলয় মিসাইলের রুটিন উৎক্ষেপণ ভারতের স্বল্প‑পরিসরের ব্যালিস্টিক ক্ষমতা শক্তিশালী করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই ধরনের প্রযুক্তি দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে অর্জিত, যা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।



