১ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে গ্রীনউইচ মান সময় (GMT) অনুসারে গৃহীত গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বিশ্ব জুড়ে নববর্ষের সূচনা হয়। তবে সময় অঞ্চলের পার্থক্যের কারণে এই মুহূর্তটি একসাথে সব দেশে না ঘটায়; এটি ধীরে ধীরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোন দেশ প্রথম এবং কোন দেশ শেষ পর্যন্ত নববর্ষ উদযাপন করে, তা সময় অঞ্চলের মানচিত্রে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কিরিবাতি দ্বীপপুঞ্জের ক্রিসমাস দ্বীপ, যা দেশের সবচেয়ে পূর্বে অবস্থিত, পৃথিবীর প্রথম স্থান হিসেবে ১ জানুয়ারি রাত ০০:০০ টায় নতুন বছর স্বাগত জানায়। কিরিবাতি প্রায় ১.২ লক্ষ মানুষের বাসস্থান এবং এর গ্রামগুলোর নাম লন্ডন, প্যারিস, পোল্যান্ড এবং এমনকি বানানা পর্যন্ত রয়েছে। ১৯৯৫ সালে আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা (International Date Line) পূর্ব দিকে সরিয়ে এই দেশটি সমগ্র জাতিকে একই সময়ে নববর্ষ উদযাপনের সুযোগ দেয়।
কিরিবাতির পর স্যামোয়া এবং টোঙ্গা দ্বীপগুলো সময়ের পরবর্তী ধাপ হিসেবে আসে। এদের পরে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া, তারপর এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ক্রমানুসারে নববর্ষের ঘণ্টা বাজায়। শেষ পর্যন্ত আমেরিকান সামোয়া, যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, সর্বশেষ বসতিবাসযুক্ত স্থান হিসেবে রাত ২৪:০০ টায় নতুন বছর স্বাগত জানায়। এই সময়ে পৃথিবীর অধিকাংশ অংশ ইতিমধ্যে নতুন বছর উদযাপন করে চলেছে।
অদ্ভুতভাবে, মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরে থাকা সামোয়া দ্বীপটি আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার বিপরীত পাশে অবস্থিত, ফলে দু’টি দ্বীপের মধ্যে ২৪ ঘন্টার সময় পার্থক্য থাকে। এই পার্থক্যটি পর্যটকদের জন্য অনন্য সুযোগ তৈরি করে; তারা প্রথমে সামোয়ায় নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে, তারপর দ্রুত আমেরিকান সামোয়ায় ফিরে একই মুহূর্তে আবারও নতুন বছর উদযাপন করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অদ্ভুত ভূখণ্ড যেমন বেকার দ্বীপ এবং হাউল্যান্ড দ্বীপ, যদিও জনবহুল নয়, তবু আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার পরে সবচেয়ে দেরিতে নববর্ষের ঘণ্টা শোনে। এই দ্বীপগুলোতে মানব উপস্থিতি না থাকলেও, পাখি ও নক্ষত্রের আলোই একমাত্র সাক্ষী।
সময় অঞ্চলের এই জটিলতা আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, “সময় অঞ্চলের সমন্বয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিমান চলাচল এবং সামুদ্রিক রুটের পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব ফেলে; তাই সময়ের পরিবর্তনকে কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।” একইভাবে, জাতিসংঘের সময় ও তারিখ সংক্রান্ত কমিটি নিয়মিতভাবে দেশগুলোর সময় অঞ্চল পরিবর্তনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে, যাতে বৈশ্বিক সমন্বয় বজায় থাকে।
কিরিবাতির ১৯৯৫ সালের আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা পরিবর্তন একটি উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সময়ে দেশটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে, যাতে দ্বীপপুঞ্জের সকল বাসিন্দা একই সময়ে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনের সময়সূচি সুশৃঙ্খল থাকে। এই ধরনের সময় সমন্বয় কেবল সাংস্কৃতিক নয়, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
অঞ্চলীয় সংঘর্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে সময় অঞ্চল পরিবর্তন কখনও কখনও উত্তেজনা বাড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কিছু দেশ তাদের সীমান্তের নিকটবর্তী সময় অঞ্চলকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে, যা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সময়ের পার্থক্য বাড়িয়ে দেয়। তবে বর্তমান সময়ে অধিকাংশ দেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে, যাতে বৈশ্বিক যোগাযোগে কোনো বাধা না সৃষ্টি হয়।
সারসংক্ষেপে, পৃথিবীর প্রথম নববর্ষের ঘণ্টা কিরিবাতির ক্রিসমাস দ্বীপে শোনা যায়, আর শেষটি আমেরিকান সামোয়ায় বাজে। এই সময়ের ক্রমবিকাশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কূটনৈতিক আলোচনা এবং ভৌগোলিক কৌশলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সময় অঞ্চল সংক্রান্ত কোনো পরিবর্তন হলে তা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, যাতে বৈশ্বিক সময়সূচি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন কোণে মানুষ যখন নতুন বছর উদযাপন করে, তখন সময়ের এই ধারা একটি সূক্ষ্ম কিন্তু শক্তিশালী সংযোগের কাজ করে, যা মানবজাতির সমন্বিত অগ্রগতির প্রতীক।



