আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এই বছর মব সন্ত্রাসের শিকারে মোট ১৯৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অধিকাংশ ঘটনা দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহরে ঘটেছে এবং ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও গুজবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে।
গত বছর একই সময়ে মব সন্ত্রাসে অন্তত ১২৮ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছিল, যা এই বছরের মৃত্যুর সংখ্যার তুলনায় কম। তবে সামগ্রিকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসের মেয়াদে মোট ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে বলে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, ২০২৫ সালে ঢাকায় ২৭ জন, গাজীপুরে ১৭ জন, নারায়ণগঞ্জে ১১ জন, চট্টগ্রামে ৯ জন এবং কুমিল্লায় ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে প্রত্যেক জেলায় ৬ জন করে নিহত হয়েছে। লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে ৫ জন, নরসিংদী ও যশোরে ৪ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
অগাস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে মব পিটুনির ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটেছে। শিকারের মধ্যে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ৭ জন, নারী ৩ জন এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত, যা সামাজিকভাবে দুর্বল গোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার অসম প্রভাবকে তুলে ধরে।
মব সন্ত্রাসের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব এবং ক্ষমতার আধিপত্যের প্রচেষ্টা উল্লেখ করা হয়েছে। “তওহীদী জনতা” নামে পরিচিত গোষ্ঠী ঐতিহাসিক ও শিল্প-সাহিত্যিক স্থাপনা ভাঙচুর, নারী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের হেনস্তা সহ বিভিন্ন অপরাধে যুক্ত হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ২০২৫ সালে ৩৮টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এদের মধ্যে ২৬ জন গুলিতে বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন, আর ১২টি ঘটনা থানায় হেফাজতে মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালে একই ধরনের অপরাধে ২১ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছিল।
কারাগারগুলিতে ২০২৫ সালে মোট ১০৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে ৬৯ জন হজতী ও ৩৮ জন কায়েদি। সর্বোচ্চ ৩৮ জনের মৃত্যু ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঘটেছে। এই সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মব সন্ত্রাসের শিকারদের অধিকাংশই নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই গোষ্ঠীগুলোর ওপর সহিংসতার প্রভাব সমাজে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, মব সন্ত্রাসের ঘটনাগুলোর তদন্তে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি মামলায় অপরাধী সনাক্তকরণ, সাক্ষ্য সংগ্রহ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলমান।
অধিকাংশ ঘটনার জন্য ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্তকর্তারা গুজব ও সামাজিক মিডিয়ার ভূমিকা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা রোধে নীতি প্রণয়নের সুপারিশ দিচ্ছেন।
মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই প্রতিবেদনকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে সরকারের কাছ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। মব সন্ত্রাসের শিকারদের পরিবার ও সমাজের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কমাতে সমন্বিত নীতি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলা হয়েছে।



