সিরিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে, আল জাজিরা আরবিকের একটি তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বশার আল-আসাদের সহায়ক কর্মকর্তারা দেশের নিরাপত্তা নষ্ট করার জন্য গোপন পরিকল্পনা চালাচ্ছিলেন। এই তথ্যগুলো ৭৪ ঘণ্টার বেশি লিক হওয়া অডিও রেকর্ডিং এবং শত শত পৃষ্ঠার নথিপত্রের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়েছে, যা বুধবার সন্ধ্যায় “আল-মুতাহারি” (ইনভেস্টিগেটর) শোতে সম্প্রচারিত হবে।
প্রধান দায়িত্বশীল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন সুহেইল আল-হাসান, যিনি পূর্বে টায়গার ফোর্সেস নামে পরিচিত এক্সক্লুসিভ ইউনিটের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন। লিকড ডকুমেন্টে দেখা যায়, আল-হাসান এবং তার সহকর্মীরা পুনরায় সংগঠিত হয়ে তহবিল সংগ্রহ, অস্ত্র সরবরাহ এবং অন্যান্য সম্পদ 확보 করার চেষ্টা করছিলেন, যাতে তারা সরকার পতনের পর দেশের অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডিংয়ে একটি হ্যাকার বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চিহ্নিত সূত্র আল-হাসানকে ইসরায়েলি সমর্থনের নিশ্চয়তা দিচ্ছিল। সূত্রের কথায়, “ইসরায়েলের রাষ্ট্র, তার সব সক্ষমতা নিয়ে, আপনার পাশে থাকবে”। আল-হাসান উত্তর দিয়েছেন, “আমার চেয়ে উচ্চতর কোনো স্তর আছে, মি. রামি হলেন সমন্বয়কারী” এবং যোগ করেন, “আমার কাছে বিপজ্জনক গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে”।
এই প্রকাশের সময়, সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে গঠিত মিত্রবাহিনী এক বছরেরও বেশি আগে দ্রুতগতির আক্রমণ চালিয়ে বশার আল-আসাদের ৫৪ বছরের শাসন শেষ করে তাকে রাশিয়ার আশ্রয়ে পাঠিয়ে দেয়। শাসন পতনের পর, ইসরায়েল সিরিয়ার অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সামরিক অভিযান বাড়িয়ে দেয়। এই অভিযানগুলিতে সিরিয়ার প্রধান বিমানবন্দর, বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যোদ্ধা বিমান এবং অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, পাশাপাশি গোলান হাইটসের অধিকাংশ অংশ দখল করা এবং জুলাই মাসে রাজধানী দামাস্কাসে বোমা হামলা চালানো হয়েছে।
আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (ACLED) অনুযায়ী, গত এক বছরে ইসরায়েল সিরিয়ার ওপর ৬০০টিরও বেশি বিমান, ড্রোন বা আর্টিলারি আক্রমণ চালিয়েছে, যা গড়ে দিনে প্রায় দুইটি আক্রমণ হিসেবে রেকর্ড হয়েছে। এই ধারাবাহিক আক্রমণ সিরিয়ার অবকাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে তীব্রতর করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে।
প্রকাশিত রেকর্ডিং এবং নথিপত্রের ভিত্তিতে স্পষ্ট হয় যে, আল-আসাদের প্রাক্তন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে সিরিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিমণ্ডলকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা গড়ে তুলেছেন। এই পরিকল্পনা শুধুমাত্র তহবিল ও অস্ত্র সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার এবং উচ্চতর সমন্বয়কারী ব্যক্তির মাধ্যমে কৌশলগত নির্দেশনা প্রদানকে অন্তর্ভুক্ত করে।
এই তথ্যের প্রকাশ সিরিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে প্রভাবিত করতে পারে। বর্তমান সরকারকে এখন ইসরায়েলি সমর্থিত গোপন পরিকল্পনার মুখোমুখি হতে হবে এবং দেশের নিরাপত্তা পুনর্গঠন ও অভ্যন্তরীণ সংহতি বজায় রাখার জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জটিলতা বাড়বে, যা শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করবে।
অধিকন্তু, আল-হাসান ও তার সহকর্মীদের এই গোপন পরিকল্পনা প্রকাশের ফলে সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে বিশ্বাসের ফাটল সৃষ্টি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বাহ্যিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। ইসরায়েলের এই ধরনের সমর্থন সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলবে, বিশেষ করে গোলান হাইটসের অধিকার নিয়ে চলমান বিরোধে।
সারসংক্ষেপে, আল জাজিরা আরবিকের তদন্তে প্রকাশিত তথ্যগুলো দেখায় যে, আল-আসাদের প্রাক্তন কর্মকর্তারা ইসরায়েলের সমর্থনে সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর জন্য গোপন পরিকল্পনা গড়ে তুলেছেন। এই পরিকল্পনা তহবিল, অস্ত্র এবং গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত। ভবিষ্যতে এই প্রকাশের ফলে সিরিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা ও চ্যালেঞ্জের উদ্ভব ঘটতে পারে।



