উত্তরের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন দ্বীপচর বজরা দিয়ারখাতার এক কৃষক পরিবারে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে মৌলিক সহায়তার অভাব দেখা দিয়েছে। ৬০ বছর বয়সী মমেনা খাতুন, যিনি এই দ্বীপে পেটের দায়ে মাঠে কাজ করেন, তার পরিবারে কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি।
মমেনা খাতুন চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র নদের পার্শ্ববর্তী বজরা দিয়ারখাতার বাসিন্দা, যেখানে শীতের তাপমাত্রা হিমশীতল হয়ে গিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, এই শীতকালে এখনও কোনো কম্বল পাননি এবং শিশুরা শীতের কারণে কষ্ট পাচ্ছে। কাপড় কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থের অভাব তাদের দৈনন্দিন জীবনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
মমেনার পরিবারে তার কন্যার ছয় সন্তানসহ আটজন সদস্য রয়েছে, তবে পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য নেই। শীতের তীব্রতা কাজের ইচ্ছা কমিয়ে দেয়, তবে কাজ না করলে জীবিকা নির্বাহের উপায় থাকে না, তাই তিনি বাধ্য হয়ে মাঠে ফিরে যান।
বুধবার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা তীব্র শীত উপেক্ষা করে বোরো ধান, পেঁয়াজ, আলু ও ভুট্টা রোপণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও ফসলের মৌসুম বজায় রাখতে তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
মহিলা কৃষক মজিদুল জানান, শীত ও কুয়াশার কারণে ভোরে উঠতে পারছেন না। তিনি সকাল ১০টা থেকে ১০:৩০টার মধ্যে মাঠে পৌঁছান, কাজের মাঝে বাড়ি ফিরে আগুনে হাত-পা গরম করেন, তারপর আবার কাজে ফিরে যান।
একই গ্রাম থেকে মজিদুল, কাদের ও মীরবকসও জানান, শীতের তীব্রতা এবং ঘন কুয়াশা তাদের কাজের সময়সূচি পরিবর্তন করেছে। তারা সাধারণত সকাল ১০টার পরে মাঠে যান এবং বিকাল ৪টার কাছাকাছি কুয়াশা ঘন হয়ে কাজ থেমে যায়।
গৃহবধূ জহিরন উল্লেখ করেন, সারাদিন ঠাণ্ডা পানির সঙ্গে কাজ করার ফলে হাত-পা কুঁকড়ে যায় এবং চুলকানি হয়। দুই দিন আগে তার এক বছর বয়সী শিশুর বমি ও পাতলা পায়খানা শুরু হয়েছে, তবে নিকটবর্তী কোনো চিকিৎসা কেন্দ্র নেই।
জহিরন বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে নিকটস্থ থানায় যেতে অনেক সময় লাগে এবং খরচও বেশি। তাই তারা ঘরোয়া টোটকা দিয়ে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করছেন, যা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই সমস্যাটি শুধুমাত্র এক গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়; জেলা জুড়ে ১৬টি নদ-নদীর তীরবর্তী ৪২০টি চরে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ একই ধরনের শীতকালীন কষ্টের মুখোমুখি। অধিকাংশ পরিবার নিম্ন আয়ের এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।
অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবের ফলে এই চরের মানুষ প্রায়ই নিজস্ব প্রচেষ্টায় সমস্যার সমাধান করতে বাধ্য হয়। যদিও তারা কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকার চেষ্টা করে, তবে মৌলিক সহায়তা ছাড়া তাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা শীতের তীব্রতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই তাপমাত্রা বিশেষ করে বয়স্ক ও ছোট শিশুরা, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের জন্য স্বাস্থ্যগত হুমকি তৈরি করে।
দীর্ঘ সময় শীতের সংস্পর্শে থাকা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, হাইপোথার্মিয়া এবং পুষ্টি ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ায়। পর্যাপ্ত উষ্ণতা, পুষ্টিকর খাবার এবং পরিষ্কার পানির সরবরাহ না হলে রোগের হার বৃদ্ধি পেতে পারে।
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে, স্থানীয় প্রশাসন ও মানবিক সংস্থাগুলোর জরুরি কম্বল, উষ্ণ পোশাক এবং মৌলিক চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করা জরুরি। পাশাপাশি, মোবাইল স্বাস্থ্য ইউনিটের মাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয় করা হলে রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সম্প্রদায়কে শীতকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন করা, সঠিক পুষ্টি ও হাইড্রেশন বজায় রাখতে নির্দেশনা প্রদান এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। আপনি কি আপনার এলাকায় শীতকালীন সহায়তা পেতে কোনো উদ্যোগে অংশ নিতে ইচ্ছুক?



