বেলারুশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে রাশিয়ার উন্নত ওরেশনিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র দেশের নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক ক্ষমতা হিসেবে বেলারুশকে কৌশলগত স্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
বেলারুশের সামরিক বাহিনীর একটি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রের কমব্যাট ডিউটি শুরু হয়েছে এবং সেগুলো নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে সেবা দিতে প্রস্তুত। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পূর্বে এই সিস্টেমের গতি ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা সম্পর্কে মন্তব্য করে উল্লেখ করেছেন যে এটি শব্দের চেয়ে দশ গুণ দ্রুত এবং বর্তমান এয়ার ডিফেন্স প্রযুক্তি এটিকে আটকাতে সক্ষম নয়।
ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ কার্যপরিসীমা প্রায় ৫,৫০০ কিলোমিটার, যা বেলারুশ থেকে পুরো ইউরোপীয় মহাদেশের বেশিরভাগ অংশকে আচ্ছাদিত করতে সক্ষম। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানান যে এই পরিসীমা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, ফলে বেলারুশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ওরেশনিকের মোতায়েনের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে এই নতুন হুমকির মোকাবিলায় এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের আধুনিকীকরণ ত্বরান্বিত করতে হবে। একই সঙ্গে, পশ্চিমা কূটনীতিকরা বেলারুশের এই পদক্ষেপকে রাশিয়ার ইউক্রেনের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
ইউক্রেনকে সমর্থনকারী ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কিছু সম্প্রতি রাশিয়ার অভ্যন্তরে আঘাত হানতে সক্ষম নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে এবং বেলারুশে ওরেশনিকের মোতায়েনকে উত্তেজনার নতুন স্তরে নিয়ে এসেছে।
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বেলারুশের এই পদক্ষেপ রাশিয়ার সঙ্গে তার সামরিক সহযোগিতা আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেনকো রাশিয়ার সাথে নিরাপত্তা চুক্তি সম্প্রসারণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, যা পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান দেশগুলো বেলারুশের এই সিদ্ধান্তকে নিন্দা করে রাশিয়ার পারমাণবিক সম্প্রসারণকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে রাশিয়ার সামরিক কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন যে ওরেশনিক সিস্টেমের পূর্ণ কার্যকরী অবস্থা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চালিয়ে যাবে। বেলারুশের ভূ-ভৌগোলিক অবস্থান, রাশিয়ার সীমান্তের নিকটতা এবং ইউরোপের কেন্দ্রীয় স্থানে অবস্থিত হওয়ায়, এই সিস্টেমের স্থায়িত্ব অঞ্চলীয় নিরাপত্তা নীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।
অধিকন্তু, ন্যাটো ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ওরেশনিকের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। এই বৈঠকে সদস্য দেশগুলোকে পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলার জন্য সমন্বিত প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, রাশিয়ার এই পদক্ষেপ ন্যাটোর কৌশলগত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে পারে এবং পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসারণ রোধে আন্তর্জাতিক সমঝোতার গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলবে।
সারসংক্ষেপে, বেলারুশে রাশিয়ার ওরেশনিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের মোতায়েন ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন জটিলতা যোগ করেছে। এই সিস্টেমের বিস্তৃত পরিসীমা এবং উচ্চ গতির বৈশিষ্ট্য অঞ্চলীয় শক্তি ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে, ফলে ন্যাটো ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপের পরিণতি কী হবে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল।



