যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের শেষের দিকে ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকে মোট দশজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই পদক্ষেপের মূল কারণ হল ইরানের ড্রোন বাণিজ্য ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সহায়তা করা, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ জব্দের ঘোষণা দিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় একটি ভেনেজুয়েলান কোম্পানি এবং তার চেয়ারম্যানের নাম রয়েছে, যাদের ইরান থেকে ড্রোন ক্রয়ের অভিযোগে লক্ষ্য করা হয়েছে। এই কোম্পানি ইরানের উৎপাদিত ড্রোন সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নজরে এ ধরনের সরবরাহের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছিল।
ইরানের তিনজন নাগরিককে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সংগ্রহে জড়িত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই রাসায়নিকগুলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদনে অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার অধীনে এ ধরনের সামগ্রী রপ্তানি ও আমদানি নিষিদ্ধ।
তাছাড়া, নিষিদ্ধ ঘোষিত “রায়ান ফ্যান গ্রুপ”-এর সঙ্গে যুক্ত ইরানভিত্তিক কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই গ্রুপটি ইরানের পারমাণবিক ও রকেট প্রোগ্রামের সমর্থনে বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রমে লিপ্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একটি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হল ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা এবং তেহরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তার অবৈধ কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করা। একই সঙ্গে, ইরান ও ভেনেজুয়েলা মধ্যে প্রচলিত অস্ত্র সরবরাহের সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম গোলার্ধের স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ইরান ভেনেজুয়েলাকে প্রচলিত অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে তার সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, যা আমেরিকান নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ। এই ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের কূটনৈতিক, আর্থিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ফেব্রুয়ারি পুনরায় “সর্বোচ্চ চাপ” নীতি চালু করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের প্রতি নীতি কঠোরতর হয়েছে। সেই সময় থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি সামরিক পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা বাড়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক সুবিধায় আকাশীয় হামলা চালায়। এই আক্রমণগুলো ইরানের পারমাণবিক ক্ষমতা হ্রাস এবং তার আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।
নতুন নিষেধাজ্ঞা এই ধারাবাহিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে আর্থিক চাপ, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক হুমকি একত্রে ইরানের অবৈধ কার্যক্রমকে থামাতে লক্ষ্য করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই পদক্ষেপের ফলে ইরানের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ বাড়বে এবং তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে আর্থিক প্রবাহ কমে যাবে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তার সামরিক সহযোগিতা দুর্বল হতে পারে, যা লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যাতে বৈশ্বিক স্তরে ইরানের অবৈধ বাণিজ্যকে রোধ করা যায়। তবে এখন পর্যন্ত ইরান ও ভেনেজুয়েলা থেকে কোনো সরকারি মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রামকে লক্ষ্য করে, পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার সঙ্গে তার অস্ত্র সরবরাহের সম্পর্ককে বাধা দিতে চায়। এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পারমাণবিক অ-প্রসারণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যকে পুনরায় জোরদার করে।



