নেত্রকোনা জেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের বপন কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় কৃষকরা এখনো জমিতে চারা রোপণ ও মাটি প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ পুরো হাওরাঞ্চলের ছোট-বড় সব হাওরে পানি দেরিতে নামার পরই কৃষকরা শীতল তাপমাত্রায় চারা রোপণ শুরু করেছে। যদিও পানি শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তবে দেরি হওয়ায় ফসলের সময়সূচি বদলে গেছে; উঁচু এলাকায় আবাদ প্রায় শেষ হলেও নিচু জমিগুলোতে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে জানুয়ারি পর্যন্ত চাষ চালিয়ে যাবে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা জানিয়েছেন যে, ইনপুটের দাম—তেল, বীজ, সার, কীটনাশক—বছরের পর বছর বাড়ছে, যা তাদের উৎপাদন খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি সবসময় বিদ্যমান, যদিও গত কয়েক বছর ভাল ফলন হয়েছে। এই বছরও কৃষকরা ঝুঁকি মোকাবেলায় পূর্ণ উদ্যমে চাষ শুরু করেছে, তবে উচ্চতর খরচের কারণে লাভের মার্জিন সংকুচিত হতে পারে।
নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) জেলা প্রশিক্ষণ অফিসার ড. চন্দন কুমার মহাপাত্রের মতে, এই বছর জেলায় মোট ১,৮৫,৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ পরিকল্পনা করা হয়েছে। লক্ষ্য উৎপাদন ১,৩৩৫,০৮৫ মেট্রিক টন, যার বাজার মূল্য প্রায় ৪,৫৪০ কোটি টাকা অনুমান করা হয়েছে। হাওরাঞ্চলের ১০টি উপজেলায়, বিশেষ করে ৬টি উপজেলায়, প্রায় ৪২,০০০ হেক্টর জমিতে ৩,০০,০০০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত। এই অংশের বাজার মূল্য প্রায় ১,০২৭ কোটি টাকা।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, হাওরাঞ্চলের বোরো ধানের উৎপাদন দেশের মোট ধান সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেরিতে পানি পৌঁছানো এবং ইনপুটের দাম বাড়ার ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা শেষ পর্যন্ত ধানের বাজার মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে। যদি উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়, তবে ধানের মোট সরবরাহে সামান্য বৃদ্ধি হবে, তবে উচ্চতর উৎপাদন খরচের কারণে বিক্রয়মূল্যেও সামান্য উর্ধ্বগতি হতে পারে।
কৃষি বিভাগ হাওরাঞ্চলের একমাত্র ফসল হিসেবে ধান চাষে শুরুর থেকে শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। এর মধ্যে সেচ ব্যবস্থাপনা, সঠিক সার প্রয়োগ, কীটনাশক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ এবং ফসলের রোগ প্রতিরোধের নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত। এই সহায়তা কৃষকদের উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বিক্রি করতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, হাওরাঞ্চলের ধান উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের ধান মজুদকে শক্তিশালী করবে, যা রপ্তানি সম্ভাবনা ও অভ্যন্তরীণ মূল্য স্থিতিশীলতায় সহায়তা করবে। তবে দেরিতে সেচের প্রবেশ এবং ইনপুটের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের নগদ প্রবাহে চাপ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে ছোটখাটো কৃষকদের জন্য। তাই ঋণসুবিধা ও ক্রেডিটের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা উৎপাদন চক্রে আর্থিক বাধা না পায়।
সারসংক্ষেপে, হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের আবাদ দেরিতে শুরু হলেও লক্ষ্য উৎপাদন ও বাজার মূল্য নির্ধারিত হয়েছে। ইনপুটের দাম বাড়া এবং সেচের দেরি ঝুঁকি সৃষ্টি করলেও, কৃষি বিভাগের প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পরিকল্পিত উৎপাদন লক্ষ্য ধানের সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাজারে সম্ভাব্য মূল্য উর্ধ্বগতি এবং ধানের মজুদ বৃদ্ধি দেশের ধান বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তবে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা ও ইনপুটের সাশ্রয়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য।



