সুদানের ইল‑ফাশ শহরকে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (RSF) অক্টোবর মাসে দখল করার পর, শহরের অধিকাংশ বাসিন্দা পালিয়ে গিয়ে উত্তরের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিচ্ছেন। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, উত্তর‑পশ্চিমে অবস্থিত ছোট্ট গ্রাম কার্নিতে একটি নতুন ক্যাম্পের এলাকা মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ১৩,০০০ বর্গমিটার বৃদ্ধি পেয়ে মোট প্রায় ১৯৯,০০০ বর্গমিটার হয়েছে।
এদিকে, সুদানের নর্দার্ন স্টেটের আল‑দাব্বা শহরের কাছাকাছি অবস্থিত এল‑আফধ শরণার্থী ক্যাম্পের আয়তনও দ্রুত বাড়ছে। নভেম্বর ১৯ থেকে ৩৭০,০০০ বর্গমিটার বৃদ্ধি পেয়ে এখন ক্যাম্পের মোট এলাকা কমপক্ষে ৫,০০,০০০ বর্গমিটার, যা প্রায় ০.২ বর্গমাইলের সমান। এই দুই ক্যাম্পের সম্প্রসারণ নতুন শরণার্থীদের প্রবাহের সরাসরি প্রমাণ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষের দিকে RSF শহর দখল করার পর থেকে ইল‑ফাশ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় ১,০৭,০০০ মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। এই সংখ্যায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যারা সরাসরি হিংসা, যৌন নির্যাতন এবং গৃহবন্দি হওয়ার শিকার হয়েছে।
ইল‑ফাশের দখলের পর থেকে চলমান ৩২ মাসের সংঘাতের ফলে শহরটি ব্যাপক ধ্বংসের মুখে পড়েছে। RSF-র আক্রমণে নৃশংসতা, গণহত্যা এবং মানবিক অপরাধের রিপোর্ট পাওয়া যায়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
শরণার্থী ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবক ডাক্তার নাবিহা ইসলাম জানান, হাজারো ভয়ভীত শরণার্থী আগমনের ফলে মৌলিক চিকিৎসা ও খাদ্য সরবরাহে তীব্র ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ক্যাম্পে থাকা মানুষদের শারীরিক ও মানসিক আঘাতের পরিমাণ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
গত সপ্তাহে, জাতিসংঘের মানবিক দল প্রথমবারের মতো ইল‑ফাশে প্রবেশ করে শহরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। তারা শহরের বেশিরভাগ অংশকে নিঃশব্দ ও ধ্বংসাবশেষে পরিণত অবস্থায় দেখেছে, যা স্থানীয় সূত্রে “অপরাধের দৃশ্য” হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সমন্বয়কারী শহরের অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ইল‑ফাশ তার পূর্বের চেহারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেন এক ভুতের মতো। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শহরের অবশিষ্ট বাসিন্দাদের সংখ্যা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে বড় অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত।
শহরের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে অনেক পরিবার মৌলিক স্বাচ্ছন্দ্য—বিশেষ করে পরিষ্কার পানীয় জল ও স্যানিটেশন—বিহীন অবস্থায় বসবাস করছে। এই পরিস্থিতি রোগের বিস্তার ও মানবিক সংকটকে তীব্র করে তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, এই মানবিক সংকটের প্রতি উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আরব দেশগুলো ইতিমধ্যে সুদানের সংঘাত সমাধানে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং মানবিক সাহায্যের প্রবাহ ত্বরান্বিত করার জন্য অতিরিক্ত তহবিলের প্রস্তাব দিয়েছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও ইল‑ফাশের পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করেছে, যেখানে মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং RSF-র বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি করা হয়েছে। এই আলোচনাগুলো পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নির্ধারিত হবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, বর্তমান শরণার্থী প্রবাহ এবং ক্যাম্পের দ্রুত সম্প্রসারণ সুদানের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের নতুন পর্যায়ের সূচক হতে পারে। যদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হয়, তবে শরণার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং মানবিক সাহায্যের চাহিদা তীব্র হবে।
পরবর্তী সময়ে, জাতিসংঘ এবং মানবিক সংস্থাগুলো ক্যাম্পে মৌলিক সেবা—খাবার, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্যানিটেশন—বর্ধিত করার পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে, ইল‑ফাশে নিরাপদ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ চালু করা হবে।
সুদানের এই সংকটের সমাধান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত কূটনৈতিক ও মানবিক প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল, এবং শরণার্থীদের নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য ত্বরিত পদক্ষেপের প্রয়োজন।



