১৯৮১ সালের মে মাসে, বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেনাবাহিনীর আক্রমণে মৃত্যু ঘটার পর, তার স্ত্রী খালেদা জিয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন তিনি এক গৃহবধু, দুই সন্তানসহ ঢাকা সেনানিবাসে বসবাস করছিলেন। স্বামীর মৃত্যু দলকে দিশেহারা করে তুললেও, খালেদা জিয়া দ্রুতই দলের পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন।
বিএনপি অভ্যন্তরে স্বামীর মৃত্যুর পর দলকে কীভাবে চালিয়ে যাবে তা নিয়ে দুইটি গোষ্ঠী গঠিত হয়। কিছু সদস্যের মতে দলটি ভেঙে যাওয়া উচিত, অন্যদিকে অন্যরা দলকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানায়। এই সময়ে খালেদা জিয়া রাজনৈতিক কাজে যুক্ত হন এবং দলের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
১৯৮২ সালে তিনি দলের প্রাথমিক সদস্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন এবং এক বছরের মধ্যে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় চেয়ারপার্সন নির্বাচিত হন, যা তাকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর থেকে তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির শীর্ষে ছিলেন।
১৯৮২ সালের শেষে সেনাবাহিনীর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সরকারকে উচ্ছেদ করে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে, খালেদা জিয়া নেতৃত্বে থাকা দলটি কঠোর রাজনৈতিক দমন ও সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়। তিনি বহুবার রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেন, জেল ও নির্যাতনের শিকার হন এবং তার রাজনৈতিক অবস্থানকে অটল রাখেন।
বিএনপি নেতৃত্বে থাকা সময়ে তিনি একাধিকবার রাজনৈতিক প্রতিবাদে অংশ নেন, যার ফলে তিনি জেলখানা ও অন্যান্য শাস্তির মুখোমুখি হন। তবুও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তার এই অবিচলতা তাকে দেশের অন্যতম অটল নারী নেতা হিসেবে স্বীকৃতি এনে দেয়।
সেই সময়ের সাংবাদিক ও উপ-প্রেস সচিব সৈয়দ আবদাল আহমেদ তার জীবনের সরলতা ও সংগ্রামকে নথিভুক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্বামী মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া স্বয়ংকে স্বামীর ছায়ায় লুকিয়ে রাখতেন এবং কোনো জনসমক্ষে বক্তব্য রাখতেন না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা তার স্বামীর মৃত্যুর পরের মুহূর্তে শুরু হলেও, তিনি দ্রুতই দলীয় কাঠামো পুনর্গঠন ও নির্বাচনী কৌশল গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৮৬, ১৯৮৮ এবং পরবর্তী নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট অর্জন করে, যদিও সামরিক শাসনের সীমাবদ্ধতা তার কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে।
১৯৮১ সালের পরে, বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তবে পরে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়। এই পরিবর্তনের পরেও খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব বজায় রাখেন এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দলের নীতি ও লক্ষ্য নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
বিএনপি নেতৃত্বে তার সময়কালকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক হস্তক্ষেপ এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সময় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তিনি দলকে একাধিক রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে পরিচালনা করেন, যার মধ্যে ১৯৯০ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং পরবর্তী নির্বাচনী চক্র অন্তর্ভুক্ত।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি বহুবার নির্বাচনী জয় অর্জন করে, যদিও তার শাসনকালে সরকারী দমন নীতি ও জেলখানা তাকে এবং তার সহকর্মীদের কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। তবুও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং গণতান্ত্রিক আদর্শ বজায় রাখতে অবিচল ছিলেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সন হিসেবে তার দীর্ঘমেয়াদী ভূমিকা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তিনি পার্টির নীতি নির্ধারণ, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং নির্বাচনী প্রচারণা তত্ত্বাবধান করেন। তার নেতৃত্বে দলটি বহুবার সরকারী বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে এবং জাতীয় নীতি গঠনে প্রভাব বিস্তার করে।
আজও খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন। তার রাজনৈতিক যাত্রা স্বামীর মৃত্যুর পরের সংকট থেকে শুরু হয়ে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক মঞ্চে পৌঁছেছে। ভবিষ্যতে তার নেতৃত্বের প্রভাব এবং বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান দেশের রাজনীতিতে কীভাবে বিকশিত হবে, তা নজরে থাকবে।



