সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৩ তারিখে জানিয়েছে যে তারা শীঘ্রই ইয়েমেনের মাটিতে অবস্থিত তাদের শেষ অবশিষ্ট সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার করবে। এই সিদ্ধান্তটি সৌদি আরবের পক্ষ থেকে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার কঠোর সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার আগে প্রকাশিত হয়। ইউএই সরকারী বার্তা সংস্থার মাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে এবং এখন সব সৈন্যকে দ্রুততম সময়ে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের সামরিক নেতৃত্বের কাছ থেকে ইউএইকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল যে, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের সৈন্যবাহিনী ইয়েমেন ত্যাগ করতে হবে। এই চূড়ান্ত চাহিদা, যা পূর্বে কখনো দেখা যায়নি, ইউএইকে অবশেষে তাদের উপস্থিতি শেষ করার দিকে ধাক্কা দেয়। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, ইউএই ও ইয়েমেনের দক্ষিণে কার্যরত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, এবং সরাসরি সহযোগিতা, সৌদি আরবের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক উত্তেজনা ও আস্থার সংকটকে তীব্রতর করেছে।
ইয়েমেনের সংঘাতের শিকড় ২০১৪ সালে, যখন ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করে। তখনের প্রেসিডেন্ট আব্দ রাব্বু মনসুর আল হাদী সৌদিতে আশ্রয় নেন এবং হুথি গোষ্ঠীর দমন, হাদীর শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সৌদি আরব, ইউএই এবং ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করা হয়। ২০১৫ সাল থেকে এই জোট বিমান হামলা এবং ভূমি অভিযানসহ বৃহৎ পরিসরের সামরিক কার্যক্রম চালায়। যদিও হুথি গোষ্ঠী সম্পূর্ণভাবে দমন করা যায়নি, জোটের সদস্যদের মধ্যে কৌশলগত লক্ষ্য ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে মতবিরোধ বাড়তে থাকে।
২০১৯ সাল থেকে ইউএই ধীরে ধীরে তাদের সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে আনতে শুরু করে, যদিও জোটের প্রতি মৌখিক সমর্থন বজায় রাখে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউএই সমর্থিত এসটিসি যোদ্ধারা দক্ষিণ ইয়েমেনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে, সৌদি আরবের সর্বশেষ চূড়ান্ত সময়সীমা ইউএইকে তাদের সামরিক উপস্থিতি ত্যাগে বাধ্য করে।
ইউএইয়ের প্রত্যাহার সিদ্ধান্তের ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোনের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, সৈন্যবাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার কত দ্রুত সম্পন্ন হবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য মূল প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, ইউএইয়ের প্রত্যাহার যুদ্ধের গতিপথে কী প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষের তীব্রতা ও মানবিক পরিস্থিতিতে। তৃতীয়ত, সৌদি আরব ও ইউএইয়ের কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠন কীভাবে এগোবে, তা অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে, ইউএইয়ের প্রত্যাহার সাময়িকভাবে সংঘাতের তীব্রতা কমাতে পারে, তবে হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি মোকাবেলা করার জন্য সৌদি আরবকে নতুন কৌশল গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া, ইউএইয়ের সামরিক পদচারণা শেষ হওয়ার পর, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে আরও বেশি সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকট কমে।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, ইউএইয়ের প্রত্যাহার মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি ভারসাম্যের পুনর্গঠনের সূচক হতে পারে। যদিও ইউএই এখনও রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে জোটকে সমর্থন করে, তবে তাদের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণের শেষ হওয়া ভবিষ্যতে কূটনৈতিক সমঝোতার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে, সৌদি আরবের কঠোর পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে অন্যান্য জোটের সদস্যদেরও অনুরূপ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
ইউএই সরকারী বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রত্যাহার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হবে এবং সৈন্যদের নিরাপদে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে, প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ও লজিস্টিক্স সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত প্রকাশিত হয়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে কোনো অপ্রত্যাশিত বিকাশ ঘটলে তা দ্রুত মোকাবেলা করা যায়।
সারসংক্ষেপে, ইউএইয়ের ইয়েমেন থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ, যা সৌদি আরবের চূড়ান্ত সময়সীমার প্রতিক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে অঞ্চলের সামরিক ও রাজনৈতিক গতিপথে পরিবর্তন আসবে, এবং ভবিষ্যতে শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে, মানবিক সংকটের অব্যাহত মোকাবেলা এবং যুদ্ধের মূল কারণগুলোর সমাধান ছাড়া স্থায়ী শান্তি অর্জন কঠিন হবে।



