লস এঞ্জেলেসের বাসিন্দা মেয়ার গোটলিব, ৮৬ বছর বয়সে গত সোমবার তার বাড়িতে নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি হলোকাস্টের বেঁচে থাকা শিকারী, স্যামুয়েল গোল্ডউইন ফিল্মসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং হলিউডের স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য পরিচিত।
গোটলিবের ক্যারিয়ার ১৯৯০-এর দশকে গড়ে ওঠে, যখন তিনি স্যামুয়েল গোল্ডউইন ফিল্মসকে পুনর্জীবিত করেন এবং স্বাধীন চলচ্চিত্রের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার নেতৃত্বে কোম্পানি বহু স্বীকৃত ছবি তৈরি করে, যার মধ্যে ২০০৩ সালের ‘মাস্টার অ্যান্ড কমান্ডার: দ্য ফার সাইড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ অন্যতম।
‘মাস্টার অ্যান্ড কমান্ডার’ প্রকল্পটি ২০তম সেঞ্চুরি ফক্স, মিরাম্যাক্স এবং ইউনিভার্সাল স্টুডিওর সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত হয়। পিটার ওয়েয়ার পরিচালিত এই ছবিতে রসেল ক্রোকে নেপোলিয়ন যুদ্ধের সময় রয়্যাল নেভির ক্যাপ্টেনের ভূমিকায় অভিনয় করেন, যা গোটলিবের প্রযোজনা দক্ষতার প্রতিফলন।
চলচ্চিত্রটি দুইটি অস্কার জয় করে এবং সমালোচকদের প্রশংসা ও বাণিজ্যিক সাফল্য উভয়ই অর্জন করে। গোটলিবের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পের গভীর জ্ঞান এই সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃত হয়।
সনি পিকচারস মোশন পিকচার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও টম রথম্যান গোটলিবের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে বলেন, তিনি পুরনো সময়ের শালীনতা ও সততার প্রতীক ছিলেন এবং হলিউডে ন্যায়পরায়ণতা বজায় রেখে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার পথ দেখিয়েছেন। রথম্যানের মতে, গোটলিবের সঙ্গে কাজ করা এক অনন্য শিক্ষার অভিজ্ঞতা ছিল।
গোটলিব ২০১৩ সালের ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অব ওয়াল্টার মিটি’ ছবির পুনর্নির্মাণে এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে কাজ করেন। জেমস থারবারের ১৯৩৯ সালের ছোট গল্পের ভিত্তিতে তৈরি এই চলচ্চিত্রে বেন স্টিলার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন, যা গোটলিবের বহুমুখী স্বাদকে প্রকাশ করে।
‘মাস্টার অ্যান্ড কমান্ডার’ ছাড়াও গোটলিবের নাম যুক্ত রয়েছে ‘মিস্টিক পিজা’ (১৯৮৮), ‘ইট, ড্রিঙ্ক, ম্যান, ওম্যান’ (১৯৯৪), ‘দ্য প্রিচার্স ওয়াইফ’ (১৯৯৬), ‘লোলিটা’ (১৯৯৭), ‘টর্টিলা স্যুপ’ (২০০১), ‘সুপার সাইজ মি’ (২০০৪), ‘দ্য স্কুইড অ্যান্ড দ্য হোয়েল’ (২০০৫) এবং ‘অ্যামেজিং গ্রেস’ (২০০৬) ইত্যাদি চলচ্চিত্রে। এই ছবিগুলো তার স্বতন্ত্র স্বাদ ও শিল্পের প্রতি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে।
মেয়ার গোটলিবের জন্ম সেপ্টেম্বর ১৯৩৯-এ পোল্যান্ডে হয়, ঠিক জার্মানির আক্রমণের ঠিক আগে। নাজি শাসনের আক্রমণের পর তার পরিবার কয়েক মাস ধরে পালিয়ে বেড়ায়, রাশিয়ানদের সঙ্গে অস্থায়ীভাবে যুক্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের শ্রম শিবিরে চার বছর কাটায়। এই কঠিন সময়গুলো তার জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
একটি শীতল রাতের স্মৃতি গোটলিবের মনে আজও তীব্র; তিনি তিন-চার বছর বয়সে তার পিতার সঙ্গে শীতের তুষারপাতের মধ্যে শিবিরে কাটানো কঠিন মুহূর্তগুলো স্মরণ করেন। এই অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী জীবনে দৃঢ়তা ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
গোটলিবের পারিবারিক জীবনেও সমৃদ্ধি ছিল; তার স্ত্রী পাটিকায় গোটলিবের সঙ্গে লস এঞ্জেলেসে বসবাস করতেন। তার মৃত্যুর সংবাদ তার পরিবার ও শিল্পের বহু সহকর্মীর মধ্যে শোকের স্রোত বইয়ে দেয়।
মেয়ার গোটলিবের অবদান হলিউডের স্বাধীন চলচ্চিত্রের বিকাশে অপরিসীম। তিনি সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় ঘটিয়ে শিল্পে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেন। তার স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।



