হিন্দি চলচ্চিত্রের স্বতন্ত্র স্বরধ্বনি গড়ে তুলেছেন অনুরাগ কাশ্যাপ, সম্প্রতি তিনি মুম্বাই ত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দর্শকদের অবাক করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বর্তমান শিল্পপরিবেশে সৃজনশীল স্বাধীনতা হ্রাস পাচ্ছে এবং তা তার কাজের প্রতি আগ্রহকে প্রভাবিত করছে।
কাশ্যাপের মতে, চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, ফলে প্রযোজকরা মুনাফা ও মার্জিনের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। নতুন ধারণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখন আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে করা সম্ভব নয়; প্রতিটি প্রকল্পের আগে থেকেই বিক্রয় কৌশল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই পরিস্থিতি চলচ্চিত্র তৈরির আনন্দকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
এজন্য তিনি দক্ষিণ ভারতের দিকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি আরও সৃজনশীল উদ্দীপনা পেতে পারেন বলে বিশ্বাস করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদি এমন পরিবেশ না থাকে, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শিল্পী আত্মা নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে তার গভীর হতাশা ও বিরক্তি স্পষ্ট।
কাশ্যাপ শিল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, নিজস্ব শিল্পকে ‘দুঃখজনক’ ও ‘বিষাক্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, শিল্পের মূল উদ্দেশ্য আর গল্প বলার নয়, বরং বাণিজ্যিক লাভের দিকে ঝুঁকেছে। এই পরিবর্তন তাকে নিজের কর্মজীবন পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
তার সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সিগুলো। কাশ্যাপের মতে, এই এজেন্সিগুলো তরুণ অভিনেতাদের মুনাফার জন্য শোষণ করে এবং প্রকৃত শিল্পী বিকাশের চেয়ে তারকাখ্যাতি অর্জনে বেশি গুরুত্ব দেয়।
এজেন্সিগুলোকে তিনি ‘গ্ল্যামার-ফোকাসড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন; তারা কর্মশালার বদলে জিমে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে অভিনেতারা শারীরিকভাবে আকর্ষণীয় দেখায়। এই পদ্ধতি তরুণদের অভিনয়ের মৌলিক দক্ষতা গড়ে তোলার পরিবর্তে মুখোশের পেছনে লুকিয়ে থাকে।
একটি উদাহরণে তিনি উল্লেখ করেন, একটি অভিনেতা এজেন্সির পরামর্শে দূরত্ব বজায় রাখে, কিন্তু পরে এজেন্সি তাকে ত্যাগ করার পর আবার সাহায্য চায়। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, এজেন্সিগুলো মূলত আর্থিক স্বার্থে কাজ করে, শিল্পীর ক্যারিয়ার গড়ে তোলার চেয়ে নয়।
কাশ্যাপের মতে, এজেন্সিগুলো শিল্পীর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব নেয় না; তারা শুধুমাত্র তার জনপ্রিয়তা থেকে লাভবান হয়। ফলে অনেক তরুণ অভিনেতা সঠিক দিকনির্দেশনা ছাড়া আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে।
এছাড়াও তিনি পূর্বে কাজ করা কিছু অভিনেতার প্রতি তার হতাশা প্রকাশ করেছেন, যাঁরা এখন তারকাখ্যাতির পিছনে ছুটে চলেছেন এবং মূল শিল্পের মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন। এই পরিবর্তন তাকে আরও বেশি করে শিল্পের বর্তমান দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করেছে।
সারসংক্ষেপে, অনুরাগ কাশ্যাপের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, হিন্দি চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিকীকরণ এবং ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্টের অপ্রতুলতা তাকে মুম্বাই ত্যাগের পথে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, দক্ষিণে নতুন পরিবেশে ফিরে তিনি আবার সৃজনশীল স্বাধীনতা পেতে পারেন।
কাশ্যাপের এই সিদ্ধান্ত শিল্পের মধ্যে এক ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যদি বাণিজ্যিক চাপ এবং এজেন্সির শোষণ অব্যাহত থাকে, তবে আরও অনেক সৃজনশীল মস্তিষ্ক এই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। শিল্পের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এখনই সৃজনশীলতা ও শিল্পী উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
অনুরাগ কাশ্যাপের এই প্রকাশনা তার ভক্ত ও সহকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। তার অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শিল্পের বর্তমান সমস্যাগুলো পুনরায় বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে চলচ্চিত্র শিল্প আবার সত্যিকারের গল্প বলার মঞ্চে ফিরে আসতে পারে।



