যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ভেনেজুয়েলায় একটি ভূমি-ভিত্তিক আক্রমণ পরিচালনা করার ঘোষণা দেন। তিনি ফ্লোরিডার মার‑এ‑লাগো রিসোর্টে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেটানিয়াহুর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য শেয়ার করেন। আক্রমণটি ভেনেজুয়েলার একটি ডকিং সুবিধাকে লক্ষ্য করে, যেখানে তিনি দাবি করেন মাদক পরিবহনকারী নৌকাগুলো লোড করা হয়।
ট্রাম্পের মতে, লক্ষ্যস্থলটি এমন একটি এলাকা যেখানে মাদক লোড করা নৌকাগুলোকে প্রস্তুত করা হয় এবং সেখানে একটি বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে। তিনি উল্লেখ করেন, “ডকিং এলাকায় বড় বিস্ফোরণ ঘটেছে, যেখানে তারা নৌকাগুলোতে মাদক লোড করে, তাই আমরা সব নৌকাকে লক্ষ্য করেছি এবং এখন সেই এলাকা ধ্বংস হয়েছে।” এই বিবরণে তিনি আক্রমণের সুনির্দিষ্ট দায়িত্বশীল ইউনিট বা সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেননি।
ভেনেজুয়েলীয় সরকার এখনও এই ঘটনার স্বীকৃতি দেয়নি এবং আক্রমণের সত্যতা বা পরিণতি সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী কার্যক্রমের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাস থেকে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলার জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী, এই জাহাজগুলো মাদক পাচার করে, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
সেপ্টেম্বরের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বায়ু-আক্রমণ প্রায় দুই ডজনেরও বেশি নৌকাকে লক্ষ্য করেছে, যার ফলে কমপক্ষে ১০০ জনের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে বলে রিপোর্ট আছে। তবে, মাদক পাচারের প্রমাণের অভাবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই আক্রমণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলীয় তেল ট্যাঙ্কারগুলোকে জব্দ করেছে, দাবি করা হচ্ছে যে সেগুলো নিষেধাজ্ঞা সাপেক্ষ তেল বহন করছে এবং তটরেখার নিকটে নিষেধাজ্ঞা সাপেক্ষ ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর নৌবন্দী আরোপ করেছে।
ভেনেজুয়েলীয় সরকার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মাদক পাচার অভিযোগকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ছদ্মবেশ হিসেবে দেখছে। ক্যারাকাসের সরকার দাবি করে যে, ওয়াশিংটন মাদক পাচারকে অজুহাত করে ভেনেজুয়েলার শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক জলে জাহাজকে লক্ষ্য করা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী এবং তা বহির্ভূত হত্যা হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে জানান, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং ভেনেজুয়েলার প্রতিরোধের সম্ভাবনা বিবেচনা করলে, একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যায় না। কিছু কূটনৈতিক সূত্রের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই আক্রমণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমালোচনা উস্কে দিতে পারে এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পূর্বে উল্লেখ করেছে যে, দেশটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তার স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতরা ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সরাসরি সংলাপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যদিও নির্দিষ্ট শর্তাবলী এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। আঞ্চলিক পার্শ্ববর্তী দেশগুলো, বিশেষ করে কলম্বিয়া ও পেরু, এই উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রমের পরিধি এবং ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করবে যে, এই উত্তেজনা কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে নাকি সামরিক সংঘাতে রূপ নেবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখনই গুরুত্বপূর্ণ যে, উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপের পথ খুলে রাখা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে সমস্যার সমাধান করা। বর্তমান পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত, তবে উভয় দেশের নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হবে।



